কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫১

ফিরে এলাম আবার সেই নির্জন কারাগারে। আসার পথে কয়েদিরা আমাকে আদাব করল। কিন্তু ওদের দিকে চাইতে পারলাম না।শুধু হাত তুলে সালাম দিলাম ও লইলাম আমার মনের অবস্থা দেখে মেট আলিমুদ্দি, বাবুর্চি, ফালতু ছুটে এল।

আরো পড়ুন

ফেনীতে ৫ জয়িতাকে সংবর্ধনা

ঢাকা আরিচা মহাসড়ক অবরোধ

বললাম, “আমার মায়ের অসুখ।”

মনে পড়লো মা’র কথা। কিছুদিন আগে আমার মা খুলনা থেকে আমাকে ফোন করে বলেছিল, “তুই আমাকে দেখতে আয়, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না । আমি বাড়ি যাইতেছি।” বললাম, “মা, আমি শীঘ্রই বাড়ি যাব তোমাকে দেখতে।” এরপর শুরু হলো আমার উপর জুলুম, যশোরে গ্রেপ্তার। আমি যখন খুলনা গেলাম, মা তখন বাড়ি চলে গিয়েছেন। যশোর থেকে ঢাকা এলাম । ঢাকায় গ্রেপ্তার করে নিয়ে চলল শ্রীহট্ট। সেখানে জামিন হলো । আবার জেলগেটে গ্রেপ্তার করে নিয়ে চলল ময়মনসিংহ।

জামিন পেয়ে ঢাকায় এলাম। সিলেটে তারিখের দিন হাজির হতে হবে। আটটা মামলা আমার বিরুদ্ধে। মাসের অর্ধেক দিন চলে যায়। বরিশালে প্রোগ্রাম দিলাম। ১২ই মে সভা করব। সেখান থেকে আমার বাড়ি কাছে। আব্বাকে খবর দিলাম ১৩ তারিখে বাড়িতে পৌঁছাব। আব্বা মা নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়েছিলেন । আমার উপর আমার মা বাবার টান যে কত বেশি সে কথা কাহাকেও বোঝাতে পারব না। তাঁরা আমাকে ‘খোকা’ বলে ডাকেন।

মনেহয় আজও আমি তাঁদের ছোট্ট খোকাটি। পারলে আমাকে কোলে করেই শুয়ে থাকে । এই বয়সেও আমি আমার মা-বাবার গলা ধরে আদর করি। কিন্তু হঠাৎ ৮ই মে দিন গত রাতে ঢাকায় আমাকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা জেলে আটক করল। আমার সেই কথাই বার বার মনে পড়তে লাগল । “আমি বাঁচব না, আমাকে দেখতে আয়” মা বলেছিলেন। কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছা হলো না । সন্ধ্যা হয়ে গেল। বিছানায় শুয়ে রইলাম । লেখাপড়া করতে পারলাম না । মেট আর বাবুর্চি জোর করেই আমাকে খাওয়াতে চেষ্টা করল। গতকাল খবর এল কত লোক মারা গেছে তেজগাঁও এবং নারায়ণগঞ্জে। আজ আবার মায়ের এই অবস্থা। তারপর আমাকে একাকী রাখা হয়েছে অনেক চেষ্টা করলাম ঘুমাতে, পারলাম না ।

১০ই জুন ১৯৬৬ । শুক্রবার

আগেই লিখেছি আমাকে একা রাখা হয়েছে। কারও সাথে আলাপ করার উপায় নাই । কারও সাথে পরামর্শ করারও উপায় নাই। সান্ত্বনা দেবারও কেহ নাই । কারাগারের ভিতর একাকী রাখার মতো নিষ্ঠুরতা আর কি হতে পারে ? অন্যান্য রাজবন্দিরা বিভিন্ন জায়গায় এক সাথে যাবে, কিন্তু আমাকে কারও কাছে দেওয়া চলবে না । সরকারের হুকুম । জেল কর্তৃপক্ষের কিছুই করার নাই । নূরুল ইসলাম চৌধুরী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, জহুর আহমদ চৌধুরী, মুজিবুর রহমান (রাজশাহী) এবং তাজউদ্দীনকে পূর্বেই ঢাকা জেল থেকে বিভিন্ন জেলে আলাদা আলাদা করে রেখেছে। আমাদের দলের আর যাদের গ্রেপ্তার করে এনেছে তাদের সবচেয়ে খারাপ সেলে রাখা হয়েছে। এদের খাবার কষ্টও দিচ্ছে। মাত্র দেড় টাকার মধ্যে খেতে হবে।

সূত্র: কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ৭৭-৭৮, লেখকঃ শেখ মুজিবুর রহমান,প্রকাশকালঃ ফাল্গুন ১৪২৩/ মার্চ ২০১৭

পড়ুন আগের পর্ব :

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫০

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৪৯

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৪৮

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৪৭

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৪৬

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৪৫

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৪৪

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৪৩

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৪২

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৪১

গ্রন্থনা ও পরিকল্পনাঃ ইয়াসীন হীরা, সম্পাদনাঃ হাসিনা আখতার মুন্নী,এসজিএন