23.4 C
আবহাওয়া
৯:২৬ অপরাহ্ণ - মে ১০, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » নীল জলের স্বর্গ: শূন্য থেকে বিলিয়নিয়ার দেশ!

নীল জলের স্বর্গ: শূন্য থেকে বিলিয়নিয়ার দেশ!


বিএনএ, ঢাকা : নীল জলরাশি আর সাদা বালুর এক স্বর্গরাজ্য—মালদ্বীপ। বিশ্বের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে অবসরের প্রথম পছন্দ। কিন্তু আপনি কি জানেন, মাত্র কয়েক দশক আগেও যে দেশটি ছিল জেলেদের এক সাধারণ জনপদ, আজ তারা বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশগুলোর একটি? অন্যদিকে, আমাদের হাতে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার এবং সূর্যাস্ত-সূর্যোদয়ের কুয়াকাটা। প্রশ্ন জাগে, মালদ্বীপ যা পেরেছে, আমরা কেন তা পারছি না?

YouTube player

মালদ্বীপ মানেই যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা এক ছবি। মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যা , ১হাজার ৮৫টি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশটি যেন ভারত মহাসাগরের মুক্তোর মালা। এখানকার প্রতিটি দ্বীপ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রিসোর্ট। স্বচ্ছ পানির নিচে রঙিন প্রবালের রাজত্ব আর সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের কটেজগুলো পর্যটকদের দেয় এক রাজকীয় অভিজ্ঞতা। এই সৌন্দর্যই মালদ্বীপ আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ‘লাক্সারি ডেস্টিনেশন’ বা বিলাসবহুল পর্যটন কেন্দ্র  হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। যার মূল ভিত্তি হলো তাদের অনন্য ‘এক দ্বীপ, এক রিসোর্ট’  নীতি। দেশটির পর্যটন খাতের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।

মালদ্বীপের প্রায় প্রতিটি বিলাসবহুল রিসোর্ট একেকটি ব্যক্তিগত দ্বীপে অবস্থিত, যা পর্যটকদের পূর্ণ প্রাইভেসী বা গোপনীয়তা নিশ্চিত করে। ধনাঢ্য ব্যক্তি ও তারকাদের কাছে এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় কারণ তারা এখানে ভিড়মুক্ত পরিবেশে সময় কাটাতে পারেন ।

পানির ওপর তৈরি কাঠের নান্দনিক ভিলাগুলো মালদ্বীপের বিলাসিতার প্রধান প্রতীক। এই ভিলাগুলো থেকে সরাসরি সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল পানিতে নামা যায় এবং অনেক ভিলার মেঝে কাঁচের হওয়ায় ঘরের ভেতর থেকেই প্রবাল ও সামুদ্রিক মাছ দেখা যায়।

মালদ্বীপে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম আন্ডার-ওয়াটার বা পানির নিচের রেস্তোরাঁ এবং স্পা। সমুদ্রপৃষ্ঠের বেশ গভীরে মাছের খেলা দেখতে দেখতে ডাইনিংয়ের এই অভিজ্ঞতা পর্যটকদের এক ভিন্ন মাত্রা দেয় ।

বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোতে ব্যক্তিগত ‘বাটলার সার্ভিস’ প্রদান করা হয়, যা পর্যটকদের প্রতিটি ছোটখাটো প্রয়োজন তাৎক্ষণিক পূরণ করে।

মালদ্বীপের  বড় সম্পদ হলো এর সুনীল জলরাশি, মহাসাগরের পানির নিচে প্রবাল, উদ্ভিদ ও নানাবিধ প্রাণী। মালদ্বীপের এই উন্নতির মূল কারিগর হলো তাদের পর্যটন ব্যবস্থাপনা। দেশটির জিডিপির প্রায় ২৮ শতাংশ সরাসরি আসে পর্যটন থেকে। তারা শুধু সমুদ্র দেখায় না, তারা বিক্রি করে ‘অভিজ্ঞতা’। পর্যটকদের নিরাপত্তা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে— সঠিক পরিকল্পনা থাকলে শুধু পর্যটন দিয়েই একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে। আজ তাদের মাথাপিছু আয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

প্রতিটি দ্বীপে বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি দ্বীপের আভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলোকে পাকা করা হয়েছে। নৌপরিবহনের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হয়। এ জন্য তাদের ভর্তুকি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে চীনা সহায়তায় মালে-হুলুমালে-ভেলেনা বিমানবন্দরকে সংযুক্ত করে সেতু ও সড়ক নির্মাণ করা হয়। সামগ্রিকভাবে দ্বীপগুলোয় দেশি-বিদেশি ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হয়।

বলে রাখা ভালো, মালদ্বীপ কোনো সস্তা পর্যটন গন্তব্য নয়। প্রায় অর্ধেক খরচে আমাদের আশপাশের দেশে ঘোরা যায়। মালদ্বীপে প্রায় সবকিছুই আমদানি করতে হয়। সবকিছুই দুর্মূল্য। এসব সত্ত্বেও মালদ্বীপের পর্যটনে ব্যয়িত অর্থ উশুল হয়ে যায় সমুদ্রের নীল জলরাশির উপরে ও নিচের  নয়নাভিরাম সৌন্দয্য দেখে।

মালদ্বীপে গেলে মনে হবে, আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ। সবাই আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে। কোনো হকার, কোনো দালাল আপনার কাছে কিছু বিক্রি করতে, গছিয়ে দিতে চেষ্টা করবে না। কোনো হোটেলমালিক বা ম্যানেজার পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আপনার গাঁট কাটার চেষ্টা করবে না! মালদ্বীপ ও অন্য দ্বীপগুলোর কোথাও প্রকাশ্যে পুলিশ দেখা যায়নি। তবে অপরাধ যে নেই এমনটা বলা যায় না, কেননা ছোট্ট মাফুশি দ্বীপে রয়েছে একটা বড় কারাগার।

এবার একটু নিজেদের দিকে তাকানো যাক। আমাদেরও নদী ও সমুদ্রসম্পদ আছে। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন বা কুয়াকাটা, পাহাড়ি সাজেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু কারণে-অকারণে  এসব সম্পদকে আমরা প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছি। ভ্রান্ত নীতি, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অতিমাত্রায় লোভ ও অপরিণামদর্শিতা সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে আমরা পিছিয়ে আছি। মালদ্বীপ যেখানে প্রতিটি দ্বীপকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে, আমরা সেখানে এখনো যানজট আর অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে লড়াই করছি। আমাদেরও সমুদ্র ও পাহাড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, প্রয়োজন শুধু মালদ্বীপের মতো দক্ষ ব্যবস্থাপনা আর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি।

মালদ্বীপ আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। তারা প্রমাণ করেছে, ভূ-প্রকৃতি ছোট হলেও যদি ইচ্ছা আর পরিকল্পনা বড় হয়, তবে যেকোনো দেশ বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ কি পারবে মালদ্বীপের এই মডেলকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন বিশ্বে নিজেদের স্থান করে নিতে?

বিএনএনিউজ/শামীমা চৌধুরী শাম্মী/এইচ.এম।

 

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ