বিএনএ, ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করলে সেনাসদর সিলেকশন বোর্ড পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাই হতে হবে একজন সেনা কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রধান মাপকাঠি।
রোববার (২৬ জুলাই) ঢাকা সেনানিবাসে সেনাসদর দপ্তরে আয়োজিত ‘সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তার শারীরিক সক্ষমতা ও ফিজিক্যাল অ্যাপিয়ারেন্সও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আন্তঃসীমান্ত হুমকি, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যযুদ্ধ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তাসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের বাস্তবসম্মত ও টেকসই মডেল অনুসরণ করা সময়ের দাবি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি শুধু সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতায় নয়, বরং সমগ্র জাতির ঐক্য, প্রস্তুতি ও সহনশীলতায় নিহিত।
তিনি জানান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ধারণার আলোকে একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করবে।
বর্তমান সময়ে যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, নিরাপত্তা এখন আর শুধু সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাইবার স্পেস, তথ্যযুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রণয়ন করছে। সেখানে সংখ্যার চেয়ে সক্ষমতা, সম্প্রসারণের চেয়ে কার্যকারিতা, প্ল্যাটফর্ম বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং একক বাহিনীকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে যৌথ সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে যোগ্য কর্মকর্তাদের নির্বাচন ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তিও গড়ে উঠবে।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর যেকোনো সাফল্যে তিনি গর্ববোধ করেন, আবার কোনো নেতিবাচক ঘটনায় অস্বস্তিও অনুভব করেন। ক্যান্টনমেন্টকে নিজের গভীর আবেগ ও স্মৃতির স্থান উল্লেখ করে তিনি বলেন, শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় সেনা পরিবেশে কাটানোয় সেনাবাহিনীর নিয়ম-শৃঙ্খলা সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছেন। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টি হলেও তার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চলমান প্রায় ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বর্ডার রোড প্রকল্প শুধু সীমান্ত নিরাপত্তাই নয়, স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি পার্বত্য এলাকায় মাইন ও বিস্ফোরক অপসারণ কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাফল্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন, দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। দক্ষিণ সুদান, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও মালিতে দায়িত্ব পালনকারী সেনাসদস্যদের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সংকট, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনা এবং গত ১২ ফেব্রুয়ারির অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সেনাবাহিনী দায়িত্বশীল ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে।
ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সেনাবাহিনীকেও নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাহিনীকে আবারও নিজেদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।
বিএনএনিউজ/এইচ.এম।
![]()

