34 C
আবহাওয়া
৪:৩০ অপরাহ্ণ - সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » হাসিনা রিটার্ন : পর্দার আড়ালে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চাল?

হাসিনা রিটার্ন : পর্দার আড়ালে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চাল?


বিএনএ, ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি বড় কোনো ঝড় আসতে চলেছে? গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর, যিনি দেশ ছেড়ে ভারতের দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি সত্যিই ১৬ই ডিসেম্বরের আগে, অর্থাৎ ১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরে আসছেন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে টকশো—সব জায়গায় এখন একটাই প্রশ্ন: শেখ হাসিনা যদি ফেরেন, তবে কোন পথে ফিরবেন? আকাশ পথে নাকি কাঁটাতার পেরিয়ে সীমান্ত পথে? এই জল্পনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই গত ২৭শে সেপ্টেম্বর জামায়াত ইসলামী সমর্থিত পত্রিকা ‘দৈনিক নয়া দিগন্ত’ প্রকাশ করেছে একটি বিস্ফোরক প্রধান প্রতিবেদন—“হাসিনার ফেরার রোডম্যাপ!”।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জামায়াত সমর্থিত ’নয়া দিগন্ত’ পত্রিকা কেন এই খবরকে প্রধান শিরোনাম করল? তারা কি শেখ হাসিনার ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে? আর এর মাঝেই খবর এসেছে, গত ১৭ই সেপ্টেম্বর ভারতের শক্তিশালী স্পাই মাস্টার এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল অত্যন্ত গোপনে ঢাকা সফর করে গেছেন! কেন এই চরম গোপনীয়তা? বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের সাথে কি তাঁর কোনো রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে? এই উত্তাল পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি বলে দিয়েছে—শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ভারত ও বাংলাদেশ মিলে!

শুরুতেই আসা যাক নয়া দিগন্তের সেই বিস্ফোরক প্রতিবেদনের বিষয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে জামায়াত ইসলামী এবং আওয়ামী লীগ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। ৫ই আগস্টের পর জামায়াত নেতারা বারবার বলছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর জায়গা হবে ‘লাল দালানে’ বা কারাগারে। কিন্তু ২৭শে সেপ্টেম্বরের নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে—শেখ হাসিনা ভারতের নয়াদিল্লি থেকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হওয়ার এবং প্রয়োজনে কারাবরণ করার একটি বহুমুখী ’প্ল্যান এ, বি, সি’ রোডম্যাপ তৈরি করছেন।

প্রশ্ন উঠছে, জামায়াত কি তবে শেখ হাসিনার ফেরার ব্যাপারে নিশ্চিত? ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এখানে দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করছে। প্রথমত, তারা তাদের কর্মীদের সতর্ক রাখছে যে আওয়ামী লীগ যেকোনো সময় মাঠে ফেরার চেষ্টা করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে নয়া দিগন্ত এই প্রতিবেদনটি করে বুঝাতে চেয়েছে—পর্দার আড়ালে শেখ হাসিনাকে পুনর্বাসনের একটি আন্তর্জাতিক লবিং চলছে, যা বাংলাদেশের বর্তমান বিএনপি সরকার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এখন কথা হচ্ছে, শেখ হাসিনা যদি ১৪ই ডিসেম্বর বা ১৬ই ডিসেম্বরের আগে ফেরেন, তবে তাঁর রুট বা পথ কী হবে? রাজনৈতিক মহলে দুটি সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রথমত, আকাশ পথ: যদি শেখ হাসিনা ভারত থেকে সরাসরি বিমানে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন, তবে তা হবে অত্যন্ত নাটকীয়। কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং  ৬ শতাধিক হত্যা মামলা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছেন—শেখ হাসিনা দেশে পা রাখামাত্রই তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হবে। ফলে, আইনি প্রক্রিয়া মেনে আত্মসমর্পণ করার মানসিকতা নিয়ে এলে তিনি আকাশ পথেই আসবেন।

দ্বিতীয়ত, সীমান্ত পথ: গুঞ্জন রয়েছে, আওয়ামী লীগের একটি অংশ সীমান্ত পার হয়ে নেতাকর্মীদের নিয়ে শো-ডাউন করে শেখ হাসিনাকে দেশে স্বাগত জানানোর প্ল্যান করছে। যদি সড়ক বা সীমান্ত পথে তিনি প্রবেশ করেন, তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এক বিশাল চাপ তৈরি হবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারতের মতো একটি রাষ্ট্র শেখ হাসিনাকে কোনো বেআইনি সীমান্ত পথ ব্যবহার করতে দেবে না। তিনি যা-ই করবেন, তা হবে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক এবং রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ।

শেখ হাসিনার এই রোডম্যাপের জল্পনা-কল্পনার আগুনেই যেন ঘি ঢেলেছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের গোপন ঢাকা সফর! গত ১৭ই সেপ্টেম্বর তিনি অত্যন্ত গোপনে ঢাকায় আসেন। ভারতের এই ‘স্পাই মাস্টার’-এর সফর কেন এত গোপন রাখা হলো?

বিভিন্ন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, অজিত দোভালের এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনা ইস্যু।

গুঞ্জন উঠেছে, বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গেও ভারতের এই শীর্ষ কর্মকর্তার একটি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়েছে। ভারত মূলত বোঝার চেষ্টা করছে, শেখ হাসিনা যদি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন, তবে বিএনপির প্রতিক্রিয়া কেমন হবে। একই সাথে, বিএনপি যেন অতি দ্রুত নির্বাচনের জন্য চাপ না দেয় বা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট না হয়—সে বিষয়েও আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। নরেন্দ্র মোদি সরকার বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অংশ হিসেবেই এই গোপন মিশন পরিচালনা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই ঘোমট পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে সুদূর আমেরিকা থেকে। নিউইয়র্কে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক শীর্ষ কর্মকর্তা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—শেখ হাসিনার ইস্যুটি মূলত ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বিষয় এবং এই দুই দেশ মিলেই আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে।

আমেরিকা অতীতে শেখ হাসিনার কট্টর সমালোচক হলেও, এখন এই ইস্যুতে তারা কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নিতে রাজি হয়নি। ওয়াশিংটনের এই বক্তব্য সিগন্যাল দিচ্ছে যে, তারা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো বা তাঁর বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে ঢাকা ও নয়া দিল্লির ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এর মানে হলো, ভারত যদি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায় কিংবা শেখ হাসিনা যদি ভারতের সম্মতিতে বাংলাদেশে ফিরে আইনি লড়াই লড়তে চান, ওয়াশিংটন সেখানে কোনো বাধা দেবে না।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে এক চরম ধোঁয়াশা এবং থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে শেখ হাসিনার ১৪ই ডিসেম্বরের আগে ফেরার ঘোষণা ও নয়া দিগন্তের রোডম্যাপ ফাঁস, অন্যদিকে অজিত দোভালের গোপন সফর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলী অবস্থান—সবকিছুই ইঙ্গিত করছে যে, পর্দার আড়ালে কোনো বড় সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

সৈয়দ সাকিব

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ