বিএনএ, ডেস্ক : বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত এবং রহস্যময় শব্দটির নাম—‘ডিসেম্বর’! ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে ফিরবেন। এমনকি আদালতের যেকোনো রায় বা কারাবরণ করতেও তিনি প্রস্তুত। কিন্তু ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে, পাসপোর্টবিহীন একজন নেত্রী কীভাবে দেশে ফিরবেন? এই আলোচনাকে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রা দিয়েছে ভারতের কলকাতা ভিত্তিক জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল-এর নির্বাহী সম্পাদক অমল সরকারের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ।
তিনি শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে সামরিক কোনো হামলা নয়, বরং এক মাস্টারস্ট্রোক বা পলিটিক্যাল ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আসলেই কি ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে পা রাখছেন হাসিনা? কী এই পলিটিক্যাল সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের রহস্য?
শেখ হাসিনার এই কৌশলটি বোঝার আগে আমাদের জানতে হবে ‘পলিটিক্যাল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বা রাজনৈতিক সার্জিক্যাল স্ট্রাইক আসলে কী? সামরিক বিজ্ঞানে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক মানে হলো—পুরো দেশের ওপর যুদ্ধ না চাপিয়ে, অত্যন্ত গোপনে শত্রুর সুনির্দিষ্ট কোনো ঘাঁটিতে নিখুঁত ও ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেওয়া।
রাজনীতিতেও যখন কোনো দল বা নেতা দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘাত বা আন্দোলন এড়িয়ে, সম্পূর্ণ গোপনে এমন একটি আচমকা মাস্টারস্ট্রোক বা বড় সিদ্ধান্ত নেন যা প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি অপ্রস্তুত করে দেয়, তখন তাকে বলা হয় ‘পলিটিক্যাল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো চরম গোপনীয়তা, আকস্মিকতা এবং ন্যূনতম ঝুঁকিতে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক লাভ তুলে নেওয়া। প্রতিপক্ষ পাল্টা ব্যবস্থা বা প্রতিরোধ গড়ার কোনো সময় পায় না
দ্য ওয়াল-এর এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকার তার বিশ্লেষণে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে এই রাজনৈতিক সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সাথেই তুলনা করেছেন। তার ইঙ্গিত অনুযায়ী, শেখ হাসিনা কোনো বিশাল ঢাকঢোল পিটিয়ে বা বড় রাজনৈতিক শোভাযাত্রা করে দেশে ফিরবেন না।
পরিকল্পনাটি হতে পারে অত্যন্ত চতুর ও আকস্মিক। হয়তো বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসন যখন কোনো প্রশাসনিক কাজে বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনী ডামাডোলে ব্যস্ত থাকবে, ঠিক তখনই কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই, হঠাৎ কোনো আইনি বা কূটনৈতিক পথ ব্যবহার করে তিনি বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখবেন।
অমল সরকারের মতে, ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে আগামী ১৪ই ডিসেম্বরকেই এই ঝটিকা প্রত্যাবর্তনের দিন হিসেবে বেছে নেওয়ার সুপ্ত পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগ, যাতে প্রতিপক্ষ সরকার বা রাজপথের বিরোধীরা তাকে বাধা দেওয়ার বা গ্রেপ্তার করার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়টুকুও না পায়।
অমল সরকারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পলিটিক্যাল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক সফল করতে দিল্লিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী আলোচনা হয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের আগেই রাজপথে এক ধরণের কৃত্রিম অস্থিরতা বা তীব্র রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করা হতে পারে, যাতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যস্ত বা বিভ্রান্ত থাকে। ফলে, শেখ হাসিনা যখন হঠাৎ দেশে প্রবেশ করবেন, তখন তাকে বিমানবন্দর বা সীমান্তে আটকানোর মতো প্রশাসনিক মনোযোগ বা শক্তি যেন সাময়িকভাবে দুর্বল থাকে। এটিই হলো রাজনৈতিক সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের আসল রূপ।
তবে রাজনীতির দাবার বোর্ডে এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক কি আসলেই সফল হওয়া সম্ভব? বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিন্তু অত্যন্ত কঠোর। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকার বিগত সরকারের আমলের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছে।
এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির উপস্থাপক আদিত্য রাজ কাউল Aditya Raj Kaul শেখ হাসিনাকে ‘প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন করেছেন। যা, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনতৈকি বিশ্লেষক গোলাম মওলা রনির মতে, ভারতের অন্যতম শীর্ষ সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি যেভাবে শেখ হাসিনাকে সাবেক না বলে সরাসরি ‘প্রাইম মিনিস্টার’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার পুনর্বাসন ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে দিল্লির সুদূরপ্রসারী অবস্থানের একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তিনি মনে করেন, এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দৃঢ় প্রত্যয় কেবল বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্যই একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি আগামী দিনের বাংলাদেশি রাজনীতির সমীকরণকে আরও জটিল ও নাটকীয় করে তুলতে পারে।
তাহলে কী ভারত ও অন্যান্য পরাশক্তির ওপর ভর করে শেখ হাসিনা আচমকা দেশে ফিরবে? তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেকোনো ধরণের ঝটিকা প্রবেশ ঠেকাতে রাজপথ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা যদি আচমকা দেশে ফেরেনও, তাকে সরাসরি কারাগারে নিয়ে যাওয়ার মতো আইনি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত রয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনাও এনডিটিভি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ও আইনি কাঠামোর মধ্যেই দেশে ফিরতে চান। তবে সুনির্দিষ্ট পথটি এখনো চূড়ান্ত নয়। ফলে দিল্লির সবুজ সংকেত বা আইনি ছাড়পত্র ছাড়া এই ‘ডিসেম্বর মিশন’ সফল করা আওয়ামী লীগের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতীয় সাংবাদিক অমল সরকারের দ্যা ওয়ালের ‘পলিটিক্যাল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর বিশ্লেষণ যদি সত্যি হয়, তবে আগামী ডিসেম্বর মাসটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় একটি মাস হতে চলেছে। একদিকে আওয়ামী লীগের আচমকা প্রত্যাবর্তনের সুপ্ত পরিকল্পনা, অন্যদিকে বর্তমান সরকারের কঠোর আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে জল কোন দিকে গড়ায়, তা সময়ই বলে দেবে।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

