25 C
আবহাওয়া
২:৩৬ পূর্বাহ্ণ - মে ৮, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » কেমন হবে জামায়াতের শাহজাহান বিএনপির নাজমুলের লড়াই?

কেমন হবে জামায়াতের শাহজাহান বিএনপির নাজমুলের লড়াই?


বিএনএ, ঢাকা : চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সাতকানিয়া- লোহাগাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৫ আসনটি অন্যতম। জাতীয় সংসদের ২৯২ তম এই আসনটি নিয়ে সারাদেশের মানুষের কৌতুহল রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি চট্টগ্রাম-১৪ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের সীমানা পূণ:নির্ধারনে পর থেকে আসনটি চট্টগ্রাম-১৫ নামে পরিচয় বহন করছে।

YouTube player

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী, বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমীন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শরীফুল আলম চৌধুরী। তবে মূল ভোট যুদ্ধ হবে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী ও বিএনপির  নাজমুল মোস্তফা আমীনের মধ্যে । কেমন হবে এই দুইজনের ভোটের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে-নিই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল।

১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৭৫ হাজার ১ শত ৬২ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৩৬ হাজার ১ শত ৫০ জন। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হন। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ৬২ হাজার ৮ শত ৯৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪০ হাজার ৬ শত ৫৯ ভোট । ধানের শীষ প্রতীকে মোস্তাফিজুর রহমান পান ৩১ হাজার ১ শত ৪৫ ভোট।

১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৪ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩ শত ৫৫ জন। নির্বাচনে বিএনপির অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদ বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৭৫ হাজার ৮ শত ৫৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ৪১ হাজার ৮ শত ৬০ ভোট। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী পান ৩৫ হাজার ৪ শত ৩২ ভোট।

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৯৬ হাজার ১৫ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ২০ হাজার ৮ শত ৯১ জন। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হন। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৫ হাজার ৭ শত ৭৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদ । ধানের শীষ প্রতীকে  তিনি পান ৬৪ হাজার ১ শত ৮৪ ভোট।  নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের জাফর আহমেদ চৌধুরী পান ৪৮ হাজার ৯ শত ৩২ ভোট।

২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৭০ হাজার ৫ শত ৬০ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫ জন। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর এম শামসুল ইসলাম বিজয়ী হন। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ২০ হাজার ৩ শত ৩৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এলডিপির অলি আহমেদ । ছাতা প্রতীকে তিনি পান ৬৩ হাজার ৪ শত ১২ ভোট। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী  পান ৪৯ হাজার ৪ শত ৭২ ভোট।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পঞ্চম, অষ্টম ও নবম সংসদে জামায়াতে ইসলামী এবং সপ্তম সংসদে বিএনপি  বিজয়ী হয়।

এবার আসা যাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া- লোহাগড়া) আসনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছিল সেই বিশ্লেষণে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-১৫ সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৪৯.৪৮% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৯.৮৬%, বিএনপি ২২.৮৮%, জামায়াত ইসলামী ৪৬.২০% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১.০৬% ভোট পায়।

১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭০.৫৪% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২.৫২%, বিএনপি ৪৮.২১%, জাতীয় পার্টি ০.৭৭%, জামায়াত ইসলামী ২৬.৬০% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১.৯০% ভোট পায়।

২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৪.৬২% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২.১৫%, ৪ দলীয় জোট ৪৭.৮৮%, জাতীয় পার্টি ০.৫৫% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ২৯.৪২% ভোট পায়।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮৭.২৪% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ২০.৯৬%, ৪ দলীয় জোট ৫০.৯৯%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ২৮.০৫% ভোট পায়।

আসুন এবার জেনে নিই, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম-১৫ আসনে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? কারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন?

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। একতরফা, ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দীন নদভীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় ।

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৮৮ হাজার ১ শত ৩৫ জন। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৫ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের আবু রেজা মুহাম্মদ নেজাম উদ্দীন নদভী, জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন স্থগিত থাকায় ধানের শীষ প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আ ন ম শামসুল ইসলাম, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নুরুল আলম, উদীয়মান সূর্য প্রতীকে গণফোরামের আবদুল মোমেন চৌধুরী এবং আম প্রতীকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি এনপিপির  ফজলুল হক প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।

কিন্তু নির্বাচনের আগের দিন প্রশাসনের যোগসাজসে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন রাতে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ৩০-৪০ শতাংশ ব্যালট নিজেদের কবজায় নিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে রাখে। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দীন নদভীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত ইসলামীসহ তাদের সমমনা দল গুলো নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের দশম, ২০১৮ সালের একাদশ সংসদের এমপি আবু রেজা মুহাম্মদ নেজাম উদ্দীন নদভীকে বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী আব্দুল মোতালিবকে মনোনয়ন দেয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নেজাম উদ্দীন নদভী। ভোটার বিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুল মোতালিবকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ই আগষ্ট গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতনের পরদিন ৬ই আগস্ট রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি  ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে । নিবন্ধন স্থগিত থাকায়  এই নির্বাচনে  আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থী নেই।  মাত্র  তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী, বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমীন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শরীফুল আলম চৌধুরী। এই তিনজনের মধ্যে হেভিওয়েট প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম মহানগরীর সাবেক আমির ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। তিনি দুইবার  এই আসন থেকে সংসদ সদস্যে নির্বাচিত হয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। এছাড়া জামায়াত ইসলামী সাংগঠনিক দিক থেকে খুবই মজবুত।

বিভিন্ন গণসংযোগে দেওয়া বক্তব্যে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, আমি বড় মজলুম, নির্যাতিত। নয়টি বছর আমি কারাগারে কাটিয়েছি। আমি জেলে থাকা অবস্থায় আমার মা আমাকে ছেড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমি বড় ছেলে হিসেবে নিজের মাকে কবরে দেওয়ার সুযোগ পাইনি। এমন আবেগময় বক্তব্যের পাশাপাশি তিনি দাবি করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাকে গার্ডিয়ান অব চিটাগাং উপাধি দিয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর হেভিওয়েট প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে ভোট যুদ্ধে নেমেছেন নাজমুল মোস্তফা আমিন। তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। এর আগে তিনি দক্ষিণের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের কাছে তিনি তেমন পরিচিত নন। তার একমাত্র ভরসা বিএনপির ভোট ব্যাংক।

প্রসঙ্গত, নাজমুল মোস্তফা আমিন ছাড়া চট্টগ্রাম-১৫ আসনে আরও তিনজন বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। এরা হলেন- চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. মহিউদ্দিন, বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক জামাল হোসেন ও মুজিবুর রহমান। নাজমুলকে প্রার্থী করা হলে, এই তিনজন ও তাদের অনুসারীরা বিদ্রোহ করেছিলেন। কিন্তু হাইকমান্ডের নির্দেশে পরবর্তী সময়ে তিনজনই নাজমুলের পক্ষে কাজ করতে সম্মত হন।

এই আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা জামায়াত ইসলামীর মতো মজবুত না হলেও একেবারে নড়বড়ে নয়। দলটির প্রচুর ভোটার রয়েছে। যা জয়-পরাজয়ে বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু দলীয় প্রার্থী না থাকায় তারা ভোট কেন্দ্রে যাচ্ছে না এটা একধরনের নিশ্চিত।

তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনটি জামায়াতে ইসলামীর দুর্গ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশিবার জামায়াত যে আসনটি জিতেছিল সেটি সাতকানিয়া-লোহাগড়ার এই আসন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকা এবং বিএনপি প্রার্থী নবাগত ও তৃণমূল পর্যায়ে তেমন পরিচিত না হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হবেন, এমনটাই মনে করেন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বিএনএ নিউজ  টুয়েন্টিফোর এর পরিচালিত জরিপে  অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ ভোটার।

বিএনএনিউজ/ শামীমা চৌধুরী শাম্মী/ এইচ.এম।

Loading


শিরোনাম বিএনএ