বিএনএ, ডেস্ক : বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতিতে এক চরম নাটকীয় মোড় নিতে শুরু করেছে! হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি দলকে নিয়ে নতুন জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস ও হাফেজ মাওলানা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।

মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১ দলীয় জোট ত্যাগ করার জন্য তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে খোদ হেফাজতে ইসলাম। ফলে মাওলানা মামুনুল হকের দল যে কোন সময় জামায়াতে ইসলামীর জোট থেকে রেরিয়ে যুক্ত হতে পারে হেফাজতে ইসলামের কওমি ধারার জোটে। এই অবস্থায় ১১ দলের ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। চির বৈরী জামায়াত ও হেফাজতের এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে কি শেষ পর্যন্ত ভেঙে যাচ্ছে ১১-দলীয় জোট? এবার আসা যাক বিশ্লেষণে।
ইসলামী দলগুলোর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সূত্রপাত গত ১৬ জুলাই। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে কওমি ধারার সাতটি দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
এই বৈঠকের পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন শুরু হয়। কারণ, জামায়াতের জোটে থাকা খেলাফত মজলিস ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে তারা ১১-দলীয় জোটের কর্মসূচিতে আর অংশ নেবে না। এর আগে একই পথ বেছে নেয় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। যদিও জামায়াত দাবি করছে, দলগুলো কর্মসূচিতে না থাকলেও এখনো জোটে রয়েছে, কিন্তু বাস্তব রাজনীতি বলছে অন্য কথা।
রাজনৈতিক অন্দরমহলের খবর অনুযায়ী, ফটিকছড়ির সেই বৈঠকেই মূলত মামুনুল হকের ওপর চাপটি আসে। হেফাজত নেতারা চান, কওমি আকিদার দলগুলোর বৃহত্তর স্বার্থে মামুনুল হক যেন জামায়াতের বলয় থেকে বের হয়ে আসেন। কিন্তু মাওলানা মামুনুল হক এই চাপের মুখে দমে না গিয়ে উল্টো বল ঠেলে দিয়েছেন কওমি ঘরানার অন্য দলগুলোর কোর্টে।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বৃহত্তর কওমি বা ইসলামি ঐক্য গড়তে হলে কোনো দ্বিমুখী নীতি চলবে না। জামায়াত ছাড়ার শর্তে ঐক্য হলে, বিএনপি জোটে থাকা দলগুলোকেও তাদের জোট ছাড়তে হবে। মামুনুল হকের এই কঠোর অবস্থানের কারণে হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্ব এখন এক বড় মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক জটিলতায় পড়েছে।
ঐতিহাসিকভাবেই জামায়াতে ইসলামী এবং কওমি ধারার আলেমদের মধ্যে গভীর আদর্শিক দূরত্ব রয়েছে। মওদুদীবাদের বিরোধিতা এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে কওমি আলেমরা জামায়াতকে পুরোপুরি আপন করে নিতে পারেননি। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত যখন একটি বড় মোর্চা গঠনের চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই হেফাজতের এই নতুন মেরুকরণের চেষ্টা জামায়াতের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। জামায়াত অত্যন্ত সতর্ক ও সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখছে যে, হেফাজতের এই প্রক্রিয়া মূলত কওমি দলগুলোকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে একঘরে করার কোনো সুদূরপ্রসারী কৌশল কি না?
তবে কওমি ধারার দলগুলোর এই দূরত্বের পেছনে কেবল হেফাজতের চাপই নয়, বরং জামায়াতের সাম্প্রতিক একটি বড় নৈতিক বিপর্যয়ও ভূমিকা রাখছে! সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি অনৈতিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর নৈতিক স্খলনের অভিযোগে জামায়াত তড়িঘড়ি করে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করলেও, মাঠপর্যায়ে দলটির ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই নৈতিক স্খলনের দায় এবং দুর্নামের ভাগীদার হতে চাইছে না ১১-দলীয় জোটে থাকা খেলাফত মজলিস বা খেলাফত আন্দোলনের মতো কওমি ঘরানার অন্যান্য দলগুলো। নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে এবং জামায়াতের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক থেকে নিজেদের দূরে রাখতেই তারা জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছে হেফাজত মূলত কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে একটি বৃহত্তর সমন্বয় মঞ্চ তৈরি করতে চায়। তারা জামায়াতের সাথে নির্বাচন বা জোটের চেয়ে নিজেদের ভেতরের ঐক্য এবং কওমি ঘরানার স্বার্থরক্ষা তাদের কাছে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। নির্বাচনের রাজনীতি এবং আদর্শিক শ্রেষ্ঠত্ব— এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ১১-দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ এখন খাদের কিনারায়। একদিকে হেফাজতের চাপ, অন্যদিকে মামুনুল হকের পাল্টা শর্ত; এই নতুন চাল জামায়াত ও হেফাজতের মধ্যকার লড়াইকে কোন দিকে নিয়ে যায়, তা সময়ই বলে দেবে।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

