30.2 C
আবহাওয়া
৭:২৮ অপরাহ্ণ - জুলাই ২৮, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » ১৯৭১-এর বাংলাদেশ টু ২০২৬-এর বেলুচিস্তান!

১৯৭১-এর বাংলাদেশ টু ২০২৬-এর বেলুচিস্তান!


বিএনএ, ঢাকা: ১৯৭১ সালে যে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা পূর্ব বাংলায় বাঙালিদের রক্তে হোলি খেলেছিল, পাচদশক পর ঠিক একই স্ক্রিপ্ট, একই নাটক আর একই বর্বরতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তানে। নির্বিচারে গুম, ডেথ স্কোয়াডের মাধ্যমে টার্গেটেড কিলিং আর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন— খোদ জাতিসংঘ যাকে বলছে ‘ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’।

কিন্তু এই পৈশাচিকতার জবাব দিতে এবার অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে বেলুচ নারীরা! রক্ষণশীল সমাজ ভেঙে পাহাড়ি গেরিলা যুদ্ধ থেকে শুরু করে মজিদ ব্রিগেডের আত্মঘাতী স্কোয়াড— সবখানে এখন নারীদের দাপট। সম্প্রতি বেলুচ লিবারেশন আর্মির প্রথম উচ্চপর্যায়ের প্রকাশ্য নারী কমান্ডার শাইনাজ বালোচ, যার যুদ্ধনাম ‘সাদো’, তাঁর একটি জবানবন্দি কাঁপিয়ে দিয়েছে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদরদপ্তরকে।

কে এই শাইনাজ? কেন তিনি মুক্তির জন্য অস্ত্র ধরাকে দর্শনের আলোতে দেখছেন? বেলুচদের এই লড়াইয়ের পেছনে কি সত্যিই ভারত বা ইসরায়েলের মতো আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের হাত রয়েছে? নাকি পাকিস্তান নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনছে?

আমাদের অনেকেরই ধারণা বেলুচিস্তান সবসময়ই পাকিস্তানের অংশ ছিল। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সময় বেলুচিস্তান ছিল মূলত ‘কালাত রাজ্য’ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম অঞ্চল। ১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট ব্রিটিশরা কালাতকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এই স্বাধীনতা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র সাড়ে সাত মাস। ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কালাত আক্রমণ করে জোরপূর্বক এক চুক্তিপত্রে সই করিয়ে বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করে। সেই দিনটিকেই বেলুচ জাতি তাদের ‘কালো দিন’ এবং ‘গোলামির সূচনা’ হিসেবে গণ্য করে। গত ৭ দশকে এই জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে বেলুচ পাহাড়ে ৫ বার বড় ধরনের সশস্ত্র বিদ্রোহ বা গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে, যার সর্বশেষ ধাপটি এখন চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি আর্মি যেভাবে বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে হত্যা ও নিখোঁজ করেছিল, ঠিক সেই একই ‘ফরমুলা’ তারা এখন বেলুচিস্তানে প্রয়োগ করছে। প্রদেশটির প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা আর তামার খনি লুট করলেও, বেলুচ জনগণের ভাগ্যে জুটেছে শুধু দারিদ্র্য। যখনই কেউ এর প্রতিবাদ করেছে, তাকেই শিকার হতে হয়েছে পাকিস্তানের কুখ্যাত ‘নোট অ্যান্ড ডাম্প’  পলিসির। আইএসআই  এবং আধাসামরিক বাহিনী ফ্রন্টিয়ার কোর প্রতিদিন বেলুচ ছাত্র, ডাক্তার, প্রকৌশলী এবং কবিদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর তাদের কোনো খোঁজ মেলে না। পরবর্তীতে পাহাড়ের খাঁজে বা মরুভূমিতে মেলে তাদের বুলেটবিদ্ধ, বিকৃত লাশ। বেসরকারি হিসেবে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজারেরও বেশি বেলুচ নাগরিক গুম হয়েছেন। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্থানীয় অপরাধীদের নিয়ে গড়ে তুলেছে ‘ডেথ স্কোয়াড’, যাদের কাজ হলো প্রকাশ্য দিবালোকে বেলুচ স্বাধিকার আন্দোলনকারীদের হত্যা করা। ঠিক যেমনটা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে করেছিল আল-বদর বা আল-শামস বাহিনী।

এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জবাবেই জন্ম নিয়েছে বেলুচ লিবারেশন আর্মি। আর এই আর্মির মজিদ ব্রিগেডের প্রথম সারির নারী কমান্ডার শাইনাজ বালোচ ওরফে সাদো তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে এক নতুন দর্শনের অবতারণা করেছেন। শাইনাজ অত্যন্ত ক্ষুরধার ভাষায় সমাজে নারীদের প্রতি লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতিত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একজন পুরুষ যখন জীবন বাজি রেখে অভিযানে যায়, তাকে দেখা হয় ‘আদর্শবাদী সৈনিক’ হিসেবে। কিন্তু একজন নারী গেলে কেন তার পেছনে মানসিক দুর্বলতা বা শোকের অজুহাত খোঁজা হয়? শাইনাজের স্পষ্ট উক্তি— ক্ষমতার হাতবদল বা শুধু সীমানা পরিবর্তন তাদের লক্ষ্য নয়; তাদের লক্ষ্য এমন এক স্বাধীন সমাজ যেখানে সম্পদের ওপর সবার যৌথ মালিকানা থাকবে এবং নারীরা কোনো বৈষম্যের শিকার হবে না। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কখনো যুক্তির ভাষা বোঝে না, তাই ফরাসি দার্শনিক ফ্রাঁৎস ফানোঁর থিওরি মেনে সশস্ত্র প্রতিরোধই একমাত্র পথ।

তবে বেলুচদের এই লড়াই কি শুধু তাদের নিজেদের শক্তিতেই চলছে? পাকিস্তান সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, বিএলএ-কে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW), আফগানিস্তানের সাবেক সরকার এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি ‘ডিপ স্টেট’। বিশেষ করে চীন যখন বেলুচিস্তানের সমুদ্র উপকূলে ‘গোয়াদর বন্দর’ নির্মাণ করে ‘সিপেক(CPEC) প্রকল্পের মাধ্যমে এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে, তখন আমেরিকা এবং ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থেই বেলুচ বিদ্রোহীদের সমর্থন দেওয়া হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন।  তবে বিএলএ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের মূল শক্তি চোরাচালানের অস্ত্র এবং খোদ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কালোবাজারে কেনা আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পূর্ব পাকিস্তানকে ধরে রাখতে পারেনি তাদের নিজেদের অহংকার আর অন্যায়ের কারণে। ২০২৬ সালে এসে বেলুচিস্তানের পাহাড় থেকে যে প্রতিধ্বনি আসছে, তা পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, অস্ত্রের জোরে একটি পুরো জাতিকে চিরকাল গোলাম বানিয়ে রাখা যায় না।

 

শামীমা চৌধুরী শাম্মী

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ