বিএনএ, ডেস্ক : জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি কি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে? একদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, অন্যদিকে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে তৈরি হওয়া দৃশ্যমান ফাটল—সব মিলিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে এলো এক কঠিন হুঁশিয়ারি। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে বলে দিলেন—’রাজপথ ও সংসদের আন্দোলন একাকার হলে কোনো বালির বাঁধ দিয়ে এই জোয়ার থামানো যাবে না।’ কিন্তু কেন এই হুঁশিয়ারি? জুলাই সনদ আর গণভোট নিয়ে কেন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তৈরি হচ্ছে চরম বিরোধ?

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। যেখানে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামী, এলডিপি, এবি পার্টিসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা। এই সমাবেশের মূল দাবি ছিল—’জুলাই সনদ’ বা জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়নে আইনি পদ্ধতি হিসেবে ‘গণভোট’ আয়োজন করা। কিন্তু এই দাবি ঘিরেই এখন রাজনীতির মাঠ দুই ভাগে বিভক্ত।”
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই সমাবেশে সরাসরি বিএনপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। জামায়াত আমিরের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক সময়ের মিত্র বিএনপির প্রতি তীব্র অসন্তোষ। তিনি অভিযোগ করেছেন—বিএনপি অতীতে মজলুম ছিল, কিন্তু এখন ক্ষমতায় আসার পর সেই দিনগুলোর কথা ভুলে যাচ্ছে।
শফিকুর রহমান একটি বড় প্রশ্ন তুলেছেন—বিএনপি কেন গণভোটের বিরোধিতা করছে? তার দাবি, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের বিকল্প নেই। এমনকি তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, রংপুরের নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি নেতারাও একসময় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাহলে এখন কেন তারা একে ‘অবৈধ’ বলছে? রাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ক্ষমতার জমিদারি দখল বা একক আধিপত্যের চেষ্টার কারণেই কি এই বিভক্তি?”
সমাবেশে শুধু বিএনপি নয়, বর্তমান সরকারের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জামায়াত আমির দাবি করেছেন, নির্বাচনে এক ধরণের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে এবং এর পেছনে দু’জন রাজসাক্ষীও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে একজন উপদেষ্টার নাম না নিয়ে তিনি বলেছেন, নিরপেক্ষ সরকারের অংশ হয়েও তিনি নাকি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর এক মন্তব্য টেনে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—অধ্যাপক ইউনূস কি লন্ডনে গিয়ে আগেই কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করে এসেছেন? যদি তাই হয়, তবে নির্বাচন কি কেবল একটি ‘তামাশা’ ছিল? এই প্রশ্নগুলো বর্তমান সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকে এক ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।”
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক এই সমাবেশে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক সম্পর্কের সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোনো দেশের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য কাউকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া মেনে নেওয়া হবে না। বিজেপির কোনো দলীয় ফোরামে বাংলাদেশকে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না—এই বার্তাটি ছিল সরাসরি প্রতিবেশি দেশ এবং সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার প্রতি এক কড়া জবাব।
সমাবেশ থেকে আসা সবচেয়ে বড় ঘোষণাটি ছিল—সংসদ এবং রাজপথের আন্দোলনকে এক করে ফেলা। বর্তমানে জামায়াতসহ জোটের শরিকরা সংসদে আছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য, আর রাজপথে আছেন মামুনুল হক বা নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীদের মতো নেতারা। এই দুই শক্তি যদি সত্যিই এক হয়ে যায়, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
প্রশ্ন এখন একটাই—সরকার কি গণভোটের দাবি মেনে নেবে? নাকি রাজপথ আর সংসদের এই জোয়ারে নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে?
সৈয়দ সাকিব
![]()

