বিএনএ, ঢাকা: বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ কি তবে শেষ হতে চলেছে? বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন হরমুজ প্রণালীর একক নিয়ন্ত্রণ এবং সব বাণিজ্যিক জাহাজ বন্ধের ঘোষণার পর, হঠাৎ করেই, কি আলোচনায় ঘুরছে যুদ্ধের মোড়?
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে, আগামী রবিবারেই নাকি হচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি! কিন্তু আসলেই কি ইরান, আমেরিকার শর্ত মেনে নিচ্ছে, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ভূ-রাজনীতি?”

কাগজে-কলমে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও, গত কয়েকদিনে পারস্য উপসাগর পরিণত হয়েছে ফুটন্ত কড়াইয়ে। হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন ‘অ্যাপাচে’ হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার পর, পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে । জবাবে মার্কিন বিমান বাহিনী, ইরানের উপকূলীয় রাডার স্টেশন ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। পাল্টা আঘাতে ইরানও, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ৭টি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে ! শুধু তাই নয়, গত ২৪ ঘণ্টাতেও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করতে যাওয়া, দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মাঝেই এসেছে চুক্তি স্বাক্ষরের খবর ।
বৃহস্পতিবার রাতে ওভাল অফিসে এক আকস্মিক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতির বড় জয় হয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক মীমাংসা বা ‘গ্রেট সেটেলমেন্ট’ চূড়ান্ত হয়েছে । ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, সব ঠিক থাকলে এই সপ্তাহান্তেই অর্থাৎ রবিবারের মধ্যে ইউরোপের কোনো এক দেশে এই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। তবে দেশটি সুইজারল্যান্ড হ্ওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আমেরিকার পক্ষে উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স এই চুক্তিতে সই করতে পারেন।
“তবে ট্রাম্পের এই একক দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই পরিষ্কার জানিয়েছেন, চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার খবরটি শুধুই মার্কিন জল্পনা-কল্পনা। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে একটি চালবাজি বলে হুশিয়ারি দিয়েছে।
চুক্তির ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প নিজেকে বিজয়ী দাবি করলেও, সূক্ষ্ম ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ট্রাম্পের একতরফা আধিপত্যের নীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। তীব্র সামরিক হুমকি ও হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন যে কোনো শর্ত ছাড়াই ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে চেয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং ইরান তাদের পরমাণু ও আঞ্চলিক স্বার্থের ‘রেড লাইন’ বা নীতিগত অবস্থানে অটল থেকে আমেরিকার ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে ।
ট্রাম্পকে কেবল ইরানের মূল তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে পূর্বনির্ধারিত সামরিক হামলা শেষ মুহূর্তে বাতিলই করতে হয়নি, বরং কাতারের মধ্যস্থতায় ৬০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতির টেবিলে বসতে হচ্ছে ।
উপরন্তু, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল অবমুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার মতো ইরানের প্রধান ৩টি কঠিন শর্ত নিয়েই এখন ওয়াশিংটনকে দরকষাকষি করতে হচ্ছে। ফলে বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের চরম আক্রমণাত্মক হুংকার শেষ পর্যন্ত ইরানের কঠোর প্রতিরোধের মুখে এক প্রকার কূটনৈতিক পিছুহঠা বা ট্রাম্পের পরোক্ষ পরাজয় হিসেবেই গণ্য হচ্ছে
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, কাতারের মধ্যস্থতায় একটি ৬০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতির খসড়া তৈরি হয়েছে বটে, যা এখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু ইরানের কট্টরপন্থী নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা কোনো ‘রেড লাইন’ বা জাতীয় স্বার্থে ছাড় দেবেন না। ইরানের প্রধান শর্ত তিনটি— হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়া, সব আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং বিশ্ব ব্যাংকে আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল অবমুক্ত করা। ।
এই চুক্তির ওপর নির্ভর করছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি। বিশ্ব ব্যাংক ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে, এই যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমকি ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘকাল বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি ১ দশমিক ৩ শতাংশে ধসে পড়বে, যা করোনাকালের পর পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বনিম্ন ।
তবে আশার কথা হলো, রবিবার চুক্তি হওয়ার এই গুঞ্জনেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটসহ এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে ।
সৈয়দ সাকিব
![]()

