বিএনএ, ডেস্ক: অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে সাড়ে তিন মাস হয়ে গেল। কিন্তু সাবেক সরকারের উপদেষ্টাদের বিতর্ক যেন পিছুই ছাড়ছে না। দেশের মানুষ এখন ক্ষোভে ফুঁসছে। তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে এক অজানা ভয়—’মব আতঙ্ক’। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, ঘরের বাহিরে বের হতেও তারা ভয় পাচ্ছেন। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান বা জনসমাগমস্থলে তাদের দেখাই মিলছে না। কিন্তু যাদের হাত ধরে দেড় বছরের শাসন চলল, সেই সাবেক উপদেষ্টারা আজ কোথায়? কেন তাদের মনে ভর করেছে চরম ‘মব আতঙ্ক’? কেন তারা এড়িয়ে চলছেন সাধারণ জনসমাগম?

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে নেওয়া বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন দেশের সাথে প্রকাশ্য-গোপন চুক্তি এবং দেদারসে জারি করা অধ্যাদেশ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন তীব্র সমালোচনা চলছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সাধারণ মানুষের ওপর। বিভিন্ন সহিংসতা আর অব্যবস্থাপনায় ঝরে গেছে পাঁচ শতাধিক প্রাণ, খালি হয়েছে শত শত মায়ের বুক। চিকিৎসার অভাবে এখনও অনেকে ভুগছেন। আর এই কারণেই দেশের মানুষ এখন চরম ক্ষুব্ধ। আর এই জনরোষেরই মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে দিন কাটছে সাবেক উপদেষ্টাদের।
দায়িত্ব ছাড়ার পর সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গুলশানে নিজস্ব বাসভবনে ওঠেন। গত ২৭ মে ঈদের আগের দিন দীর্ঘদিনের সহকর্মী লামিয়া মোরশেদকে সফরসঙ্গী করে ফ্রান্সের প্যারিসের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন তিনি। পরে নেদারল্যান্ডসেও নানা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ৩১ মে ড. ইউনূস ও লামিয়া মোরশেদ জার্মানিতে ‘বার্লিন স্টোরি বাঙ্কার’ মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তাঁদের হিটলার ও তাঁর প্রেমিকা ইভা ব্রাউনের শোবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে শিক্ষকতায় ফিরেছেন। প্রথম দিকে মাঝেমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেও এখন নিয়মিত হয়েছেন বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে বর্তমান সরকারের নজরে আসার চেষ্টা করছেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান আবারও শিক্ষকতা শুরু করেছেন। তাঁর নতুন কর্মস্থল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে পাঠদানের পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘সেন্টার ফর এনার্জি অ্যান্ড লজিস্টিকস’ পরিচালনার দায়িত্বও নিয়েছেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন ঢাকায় অবস্থান করছেন। সম্প্রতি তিনি একাধিক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদের বাহিরে সাত সদস্যের একটি অনানুষ্ঠানিক কিচেন ক্যাবিনেট ছিল, যেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। বিদায়ের ঠিক তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আলোচিত বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা ছিল না। এমনকি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর মন্ত্রণালয়ে অন্য উপদেষ্টাদের অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপের কারণে অন্তত তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
নৌপরিবহন ও শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন গবেষণা ও লেখালিখিতে সময় কাটাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফেরার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার নিজের প্রতিষ্ঠান উবিনীগে ফিরেছেন। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির সমালোচনা করে তা সংসদে আলোচনার দাবি জানাচ্ছেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লে. জে. মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ক্যান্টনমেন্টের বাসায় নিরিবিলি অলস সময় কাটাচ্ছেন। লেখালিখি এখন আর করছেন না। বিশ্রামে আছেন।
খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার লেখালিখি করে সময় পার করছেন। সম্প্রতি তিনিও গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূসের কিচেন ক্যাবিনেটের বিষয়টি জানান, যেটি প্রতি মঙ্গলবার বসত।
সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ দীর্ঘদিন পর রোববার উত্তরায় তাঁর নিজের কর্মস্থল ব্রতীর কার্যালয়ে যান। এখন থেকে নিয়মিত অফিস করবেন।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজে যোগ দেন। তবে পরিবেশ রক্ষায় এখনো কোনো নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে দেখা যায়নি তাঁকে।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী উপদেষ্টার দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকেই অন্তরালে ছিলেন। সম্প্রতি অনেকটা নীরবে স্ত্রী তিশাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। তাঁর অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাসসহ কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া সমালোচনা করেন এবং ফারুকী আর ফিরবেন না বলে মন্তব্য করেন।
ফারুকী ফেসবুক পোস্টে গুঞ্জনের জবাব দিয়ে লিখেছেন, ‘প্রত্যেকটা ভালো কাজের একটা কাফফারা দিতে হয়, এটা জেনেই সরকারে ঢোকার ঝুঁকি নিই। কিন্তু সেটা যে এইরকম ভয়াবহ হবে এটা ভাবি নাই। আমাদেরকে নিয়া এমনসব মানুষজন কথা বলতেছে, এদের উত্তর দিলেও আমাদের ইজ্জত থাকে না। এদের নিয়া কথা বলা তো দূরের কথা, এদের নামও আমাদের আড্ডায় কেউ কোনোদিন উচ্চারণ করেনি। তবে তিনি কবে দেশে ফিরবেন এবং কেন অস্ট্রেলিয়া গিয়েছেন এ ব্যাপারে কিছু লেখেননি।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় ফিরে গেছেন। নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন। ব্যাংকিং খাত সংস্কার নিয়ে পরামর্শক হিসেবেও কাজ করছেন।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বারিধারা পার্ক রোডে থাকছেন। দুইটা বই লেখার কাজে হাত দিয়েছেন। খুব একটা বাহিরে যান না। অবসর সময়ে ছবি আঁকাআঁকিতে সময় পার করছেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন নিজ ব্যবসা আকিজ-বশির গ্রুপে ফিরেছেন। নিজস্ব আকিজ-বশির অ্যাভিয়েশন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সময় দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম উপদেষ্টার পদ ছাড়ার পর পুরোনো কর্মস্থল গ্রামীণ ব্যাংকে ফিরলেও হামে শিশুমৃত্যু শুরু হওয়ার পর থেকে অনেকটা আত্মগোপনে আছেন। রাজধানীতে নিজের ফ্ল্যাটে অনেকটা বন্দি জীবন যাপন করছেন। এড়িয়ে চলছেন মানুষজন ও গণমাধ্যম।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান টেকনোক্র্যাট কোটায় নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। সম্প্রতি তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরেছেন।
এছাড়া শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আববার, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা এ এফ এম খালিদ হোসেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা দেশেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসূত্রে যুক্ত হয়েছেন।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

