তাদের কি কেউ কিছু জানায় নি!

বিএনএ ডেস্ক, ঢাকা: শেষবারের মত সন্তানের মুখটা দেখবেন সেই অপেক্ষা যেন আর ফুরায় না। দীর্ঘ প্রতীক্ষায় বসেছিলেন থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমানের বাবা মা।

আরো পড়ুন

বুধবার (৯ মার্চ) দুপুরে রোমানিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজের ২৮ নাবিক-ক্রু। সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে বিমানবন্দরে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়।

দুপুরে ঢাকা পৌঁছাবে ২৮ নাবিক বহনকারী বিমান। সেই বিমানে আসবে সন্তানের মরদেহ। এমন খবরে মরদেহ গ্রহণ করতে সকাল সকাল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাজির হাদিসুর রহমানের বাবা-মা, ভাই ও স্বজনরা।

বিমান থেকে একে একে নেমে আসলেন জাহাজের ২৮ নাবিক। তবে থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাসিদুর রহমানের কফিন কোথায়? যে সন্তানের কফিন গ্রহণ করবেন বলে ভিআইপি টার্মিনালের সামনে বাবা-মা ঘন্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন সেই সন্তানের কফিন কোথায়?

বিমানবন্দর থেকে জানানো হয় তাদের সন্তানের মরদেহ আজ আসনি। সন্তানের লাশ না পেয়ে সেই অপেক্ষা যেন আরও দীর্ঘ হতে শুরু করে হাদিসুর রহমানের স্বজনদের।

ছেলের লাশ আসবে এই আশায় বিমানবন্দর যান হাদিসুর রহমানের মা রাশিদা বেগম। বলেন, ‘শুনছিলাম আজকে হাদিসুরের লাশ আসবে, আইসা শুনি আসে নাই।

ভাইয়ের লাশ আসেনি শুনে বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনালে গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করে কাঁদছিলেন হাদিসুর রহমানের ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স। চিৎকার করে প্রশ্ন করছিলেন তার ভাইয়ের লাশ কেন আসেনি, কবে আসবে! তবে সেই প্রশ্নের উত্তর যেন সবারই অজানা। গণমাধ্যম কর্মী থেকে শুরু করে বিমানবন্দর বা সরকারের দায়িত্বশীল কেউ যেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

ছেলের ছবি হাতে বিমানবন্দরে পিতা
ছেলের ছবি হাতে বিমানবন্দরে পিতা

জীবিত সন্তান আর ফেরত আসবে একথা জানেন হাদিসুর রহমানের বাবা। তবে সন্তানকে শেষ বারের মত দেখে কবর দিতে চান জন্মভিটায়। সেই আশায় ঢাকায় আসেন বড় ছেলে হাদিসুরের লাশ নিতে। সন্তানের সহকর্মীরা সবাই ফিরেছে ফেরেনি শুধু তার ছেলেটা। সন্তানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি প্রথম থেকেই জানিয়ে যাচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রাজ্জাক হাওলাদার। বলেন, ‘সরকার আমার ছেলের লাশটা আইনা দিক। আর কোনো চাওয়া নাই। লাশটা একবার দেখতে চাই।

হাদিসুর রহমানের বাবা রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, আমার ছেলের লাশ কোথায় আছে জানি না। একবার শুনি রোমানিয়া, একবার শুনি ইউক্রেন। শুনছি রোমানিয়াতে জানাজা হইছে। আবার শুনি ইউক্রেনে ফ্রিজে রাখা হয়েছে। আসলে কোথায় আছে সঠিক খবর জানি না। বলেন, হাদিসুরের লাশ কবে দেশ আসবে তার সঠিক কোন খবর তাদের কাছে না থাকায় তারা ভেবেছিলেন ২৮ জনের সাথেই ঢাকায় আসবে হাদিসুরের কফিন। সেই আশায় ঢাকায় আসেন তারা।

তাহলে প্রশ্ন হলো, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমানের মরদেহ জীবিত ২৮ নাবিকের সাথে দেশে আসছে না এই তথ্য কি সরকার বা সংশ্লিষ্ট কেউ হাদিসুরের পরিবারকে নিশ্চিত করে কিছু জানায় নি? তারা যদি নিশ্চিত করে জানতেন তাদের সন্তানের মরদেহ আজ (৯ মার্চ) ঢাকায় আসবে না তাহলে বরগুনা থেকে কষ্ট করে ঢাকায় আসার কি দরকার ছিল তাদের? সন্তান হারানোর শোকের উপর আবার এই ধকল কেন পোহাতে হলো তাদের!

এই প্রশ্নের জবাবে বরগুনার বেতাগী উপজেলার নির্বাহী অফিসার মো. সুহৃদ সালেহীন জানান, হাদিসুর রহমানের মরদেহ ২৮ জনের সাথে দেশে আসবে কিনা সে তথ্য সরকারের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়নি। এ কারণে হাদিসুর রহমানের পরিবারকেও তিনি আর কিছু জানান নি। আবার হাদিসুর রহমানের বাবা-মা বা স্বজনরা যে ঢাকায় যাচ্ছেন সন্তানের লাশ গ্রহণ করতে সে তথ্যও নাকি তিনি জানেন না।

হাদিসুর রহমানের মরদেহ কবে ফিরিয়ে আনা হবে সে প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করে কিছুই বলা হয়নি। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝে সুবিধাজনক সময়ে হাদিসুর রহমানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলতে শোনা গেছে সংশ্লিষ্টদের।

ইউক্রেনে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। ২ মার্চ বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ২৫ মিনিটে অলিভিয়া বন্দরের জলসীমায় থাকা ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় নিহত হন জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান।

বিএনএ/এ আর