বিএনএ, ঢাকা: ১/ ১১ এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে বিএনপি সরকার। এর দুইদিন পর ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে তাকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকালে রাজধানীর মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে মামুন খালেদকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। কে এই শেখ মামুন খালেদ? ১/১১ সরকার ও পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার কী ভূমিকা ছিল? এবার আসা যাক সেই বিশ্লেষণে।

১/১১-এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকায় ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তার দ্রুত উত্থান ঘটে।
১/১১-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় শেখ মামুন খালেদ সেনাবাহিনীর সিগন্যালস কোরের একজন কর্নেল ছিলেন। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি ডিজিএফআই-এর ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স সিকিউরিটি ব্যুরো -এর পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৮ সালের জুনে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো -এর পরিচালক নিযুক্ত হন, যেখানে তিনি তৎকালীন আলোচিত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারীর স্থলাভিষিক্ত হন।
নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও শেখ মামুন খালেদের প্রভাব ও পদোন্নতি অব্যাহত থাকে, যাকে অনেকে তার ‘কৌশলী অবস্থান’-এর ফল হিসেবে দেখেন। ২০১১ সালের জুনে তিনি ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক নিযুক্ত হন এবং ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ডিজিএফআই থেকে বিদায়ের পর তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস -এর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । তিনি ছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনকারী প্রথম ব্যক্তি। শেখ মামুন খালেদ অবসরে যাওয়ার আগে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ -এর কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তিন তারকা জেনারেল হিসেবে অবসর নেন।
শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে ডিজিএফআই-কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এবং ‘আয়নাঘর’ বা গোপন বন্দিশালা তৈরির মত বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ১/১১ আমলে তিনি বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের আটক, নির্যাতন এবং চাঁদাবাজির সাথে জড়িত ছিলেন।
বিভিন্ন গোয়েন্দা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শেখ মামুন খালেদ শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম ও প্রভাব ব্যবহার করে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সেনা কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্প জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে মামুন খালেদ ও তাঁর স্ত্রী নিগার সুলতানার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ দেন। সে সময় দুদক তাঁদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছিল।
গত ২৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় রিমান্ড শুনানির সময় সাবেক ডিজিএফআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর দাবি করেন । তিনি দাবি করেন যে, ১/১১-এর সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে তারেক রহমানের জামিন নিশ্চিত করতে তিনি সরাসরি ভূমিকা রেখেছিলেন । তখন কুমিল্লায় কর্মরত ছিলেন এবং জামিনের রেফারেন্স দিতে সরাসরি বিচারকদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন শেখ মামুন খালেদ। তার এই দাবির পর সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়।
সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার দাবি ,২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি কোনো খুনের নির্দেশের সাথে জড়িত ছিলেন না। তিনি বলেন, “২০২৪ সালে আমি একজন সাধারণ নাগরিক ছিলাম, আমার নির্দেশে কে গুলি চালাবে?”। এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন যে, সেই সময় তিনি অধিকাংশ সময়েই বাসার ভেতরেই ছিলেন ।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস -এর প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদ দাবি করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের বিষয়ে তার কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছিল।
আয়নাঘর বা গোপন বন্দিশালা সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন যে, তার মেয়াদ কালে ২০১১-২০১৩ সালে এ ধরনের কোনো অভিযোগ ছিল না। এই বিষয়ে তিনি ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিশনের কাছে দুই-তিনবার সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে আদালতকে জানান।
মামুন খালেদ দাবি করেন, জলসিঁড়ি প্রকল্পের প্রয়োজনে আসিয়ান সিটির নজরুল ইসলামকে দেয়া দেড় হাজার কোটি টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছিল । তিনি শুধুমাত্র সেই অর্থ উদ্ধার প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
আদালতে ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “যদি আমি দোষী হতাম, তবে আমি যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে আসতাম না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতাগ্রহণের এক মাসের মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণকারি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়িদের নিপীড়ন-নির্যাতনকারিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সাবেক তিন তারকা জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদের গ্রেপ্তারের পর কে পরবর্তী শিকারে পরিণত হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনীতি সচেতন মানুষের মধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে ।
বিএনএ/ শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

