।।ইয়াসীন হীরা।।
১৯৮১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ভারতীয় রোমান্টিক হিন্দি সিনেমা ‘ফিফটি ফিফটি’ কথা আশির দশকে সিনেমা প্রেমিদের মনে থাকার কথা। সেখানে দুই পকেটমারের ফিফটি- ফিফটি ভাগাভাগির গল্প তুলে ধরেন পরিচালক শমু মুখার্জি। রেমান্টিক ওই সিনেমায় গীতিকার গীতিকার আনন্দ বকশীর জনপ্রিয় সেই গানের কলি ‘ফিফটি ফিফটি – আধা আধা’ যেন বাস্তবে রূপ পেয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)-এর টেন্ডার প্রক্রিয়ায়। ব্যাগিং, স্ট্যাকিং ও ক্লিনিংসহ আনুষঙ্গিক কাজের ঠিকাদার নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি অর্থ লোপাটের এই ঘটনায় কারখানাটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
১ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় ‘না’, ২ কোটি ৩০ লাখে ‘হ্যাঁ’
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রথম দফার দরপত্রে ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকাকে ‘অতিরিক্ত দর’ হিসেবে চিহ্নিত করে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ব্যয় কমার কথা থাকলেও, দ্বিতীয় দফায় উল্টো দর ওঠে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রথম দফার চেয়েও ৪৩ লাখ টাকা বেশি। আর এই অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের দরদাতা প্রতিষ্ঠান ‘আনোয়ারা ট্রান্সপোর্ট’-এর প্রতিই এমডির বিশেষ পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক কথায়- ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় ‘না’, ২ কোটি ৩০ লাখে ‘হ্যা’
পেশিশক্তির মহড়া ও সিন্ডিকেট
টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ১০টি প্রতিষ্ঠান সিডিউল কিনলেও রহস্যজনকভাবে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান—শাহ মোহসেন আউলিয়া এন্টারপ্রাইজ (২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা) এবং আনোয়ার ট্রান্সপোর্ট (২ কোটি ৩০ লাখ টাকা)—দরপত্র জমা দিতে পেরেছে। অভিযোগ উঠেছে, এমডির মনোনীত এই দুই প্রতিষ্ঠানের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা অন্য ৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কারখানায় প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট করে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে।
গোপন ভাগাভাগির গুঞ্জন
সিএফইউএল সার কারখানা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে জোর গুঞ্জন রয়েছে যে, এই বাড়তি দরের পেছনে রয়েছে এমডি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যকার ‘ফিফটি ফিফটি’ বা সমান ভাগাভাগির চুক্তি। প্রায় ৮০ লাখ টাকা বাড়তি দর দেখিয়ে সরকারের বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি করা হচ্ছে, যার বড় একটি অংশ যাচ্ছে এমডির ব্যক্তিগত পকেটে।
৩০ বছরের ‘অদ্ভুত’ অভিজ্ঞতা:
ঠিকাদার নিয়োগের শর্তাবলীতে এবার জুড়ে দেওয়া হয়েছে বিগত ৩০ বছরের অভিজ্ঞতার কঠিন শর্ত। প্রশ্ন উঠেছে, সারের বস্তা সেলাই, ব্যাগিং, স্ট্যাকিং ও ক্লিনিংয়ের মতো কায়িক পরিশ্রমের কাজগুলো করে থাকেন সাধারণ শ্রমিকরা। এখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ৩০ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত কেন? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া সুবিধা দিতেই এই কাল্পনিক ও অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
টেন্ডার বক্স নিয়ে লুকোচুরি
দরপত্র জমার ক্ষেত্রেও মানা হয়নি নিয়ম। নিয়ম অনুযায়ী অন্তত চারটি ভিন্ন স্থানে টেন্ডার বক্স থাকার কথা থাকলেও, বিশেষ উদ্দ্যেশে শুধুমাত্র সিইউএফএল কার্যালয়ে টেন্ডার দাখিলের কথা শিডিউলে উল্লেখ করা হয়। এর ফলে এমডির আশীর্বাদপুষ্ট সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য কেউ সেখানে যাওয়ার সাহস পায়নি।
পুলিশের অনুপস্থিতি
এমনকি সংবেদনশীল এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ পাহারার বিধান থাকলেও রহস্যজনক কারণে পুলিশ ডাকা হয়নি। ফলে এমডির মনোনীত ‘আনোয়ারা ট্রান্সপোর্ট’ ও ‘শাহ মোহসেন আউলিয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর ক্যাডার বাহিনী পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অন্য ৮টি প্রতিষ্ঠানকে কারখানায় ঢুকতেই দেয়নি।
ডিজিটাল যুগে ম্যানুয়াল কারসাজি
বিসিআইসি নিয়ন্ত্রাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ই-জিপি চালু থাকলেও সিইউএফএল-এ কেন ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টেন্ডার নেওয়া হলো, তা নিয়ে কারখানার ভেতরে-বাইরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রথম দফার ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার দরকে ‘বেশি’ বলে বাতিল করে দ্বিতীয় দফায় ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার উচ্চদর গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের বাড়তি ৪৩ লাখ টাকার সরাসরি লোকসান নিশ্চিত করা হয়েছে শুধুমাত্র ‘ফিফটি ফিফটি’ কমিশনের লোভে।
টেন্ডার বাতিল ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
আলোচিত-সমালোচিত কোটি টাকার এই টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে না পারা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ এবং সিএফইউএল সার কারখানার সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, যেখানে প্রথম দরপত্রকেই বেশি বলা হয়েছিল, সেখানে তার চেয়ে ৪৩ লাখ টাকা বেশি দরের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা স্পষ্ট দুর্নীতি। তারা অবিলম্বে এই টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমানের শাস্তিমূলক বদলির দাবি জানিয়েছেন। এই ব্যাপারে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে বেশ কয়েক দফা কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুনঃ সিইউএফএল: বাসা বরাদ্দে অনিয়মই যেন নিয়ম !
![]()

