31 C
আবহাওয়া
৭:৩১ অপরাহ্ণ - আগস্ট ২৩, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » সিইউএফএল: কাজ ছাড়া বেতন, আরিফুলের খুঁটির জোর কোথায়?

সিইউএফএল: কাজ ছাড়া বেতন, আরিফুলের খুঁটির জোর কোথায়?


বিএনএ, চট্টগ্রাম : একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী, পদবি তার সারের ব্যাগিং শাখার মাস্টার অপারেটর! অথচ তার দাপটে কাঁপছে দেশের বৃহত্তম সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কারখানার ‘ভিআইপি গেস্ট হাউজ’ দখল করে যিনি ধুমধাম করে পালন করেন নিজের জন্মদিন! শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে মাসের পর মাস কর্মস্থলে না এসেই তুলে নিচ্ছেন পুরো মাসের বেতন-ভাতার পাশাপাশি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা!

শুধু কী তাই, নিজের দাপট ও প্রভাব-বলয় ধরে রাখতে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ম্যানেজ করে সিবিএ নির্বাচন সিডিউল ঘোষণা করা থেকে বিরত রেখেছেন। অন্যদিকে সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে চাপ সৃস্টি ও তদবির করছেন তাকে আহ্বায়ক করে সিবিএ’র বিকল্প একটি কমিটি গঠন করার। যাতে সিইউএফএল এর পুরো প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতের মুঠোয় রাখা যায়!

চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড সিইউএফএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বিশাল সিন্ডিকেটের দূর্নীতি- অনিয়ম এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। আর এই দূর্নীতি-অনিয়ম ও প্রকাশ্য লুটপাটের প্রতিবাদ করলেই সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর নেমে আসে বদলি আর প্রশাসনিক হয়রানির নির্মম খড়্গ! আজ আমরা উন্মোচন করব সিইউএফএলের ব্যাগিং শাখার মাস্টার অপারেটর এএসএম আরিফুল ইসলামের সেই অবিশ্বাস্য ও বেপরোয়া দুর্নীতির খতিয়ান ও ফিরিস্তি!

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮৭ সালের অক্টোবরে শিক্ষানবীশ অপারেটর হিসেবে মাসিক ৬ শত টাকা ভাতায় সিইউএফএলএ যোগদান করেন আরিফ। তার পড়ালেখা এসএসসি। ১৯৮৮ সালে এসএসএ পদে ৬৪০ টাকা বেসিকে এফপিডি ব্যাগিং শাখার উৎপাদন বিভাগে যোগ দেন। তার আগে সিইউএফএল হাউজিং এর সামনে তৎকালীন চেয়ারম্যান এম,এ হান্নান চৌধুরী মন্জুর অস্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের পাশে একটি ফটোকপি মেশিনের দোকান চালাতেন। বর্তমানে কালপরিক্রমায় ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মাস্টার অপারেটর এ এস এম আরিফুল ইসলাম নিজেকে পরিচয় দেন সিবিএ বা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।

কিন্তু অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা! প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর কারখানা কর্তৃপক্ষ এক নোটিশে সিইউএফএলের সিবিএ নির্বাচন স্থগিত করে দেন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে কোনো বৈধ কমিটিই নেই! সর্বশেষ কমিটিতে শ্রমিক লীগের নুরুল আমিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং আমিনুর রহমান রানা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সিবিএর সাবেক নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন—১৯৮৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কোনো কমিটিতে, কোনো দিন, কোনো পদে এই আরিফুল ইসলামের নাম ছিলই না! তার প্রমাণ পাওয়া যায়, গত ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিল ও সিবিএ’র দুই নেতাকে বিদায় সংবর্ধনার অনুষ্ঠানের ব্যানারে। সেখানে আরিফুল ইসলামের নামের পাশে লেখা রয়েছে বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা!

উত্তর ও দক্ষিণ ভঙ্গ কল্যান সমিতির ব্যানারে আয়োজন করা হয় বিদায় সংবর্ধনা ও ইফতার মাহফিলের। আয়োজক ছিলেন আরিফুল ইসলাম। ব্যানারে ব্যবহার করা হয় সিএফইউএল, বিসিআইসি ও বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল লোগো। সেই অনুষ্ঠানে আওয়ামী সমর্থিত শ্রমিক লীগের সিইউএফএল শাখার সহসভাপতি আমিনুর রহমান রানা ও সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল আমিনকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়া হয়। এই দুই সাবেক সিবিএ নেতাকে সংবর্ধনা দিয়ে পুরো সিবিএ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অপচেষ্টা চালান তিনি।

সিইউএফএলএ আরিফের এই একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর চলছে জুলুম। সিবিএ নির্বাচনে তার সম্ভাব্য দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রবিউল ইসলাম খান ও এমরান খানকে সম্প্রতি বিসিআইসিতে তদবির চালিয়ে অন্যত্র বদলি করিয়ে দেওয়া হয়েছে! সাধারণ শ্রমিকদের দাবি—ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি প্রশ্রয় আর যোগসাজশেই আরিফ আজ এত বেপরোয়া। কারখানার এমডি মিজানুর রহমান নিজে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকায়, আরিফের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে এই পুরো সিন্ডিকেটকে পাহারা দিচ্ছেন এবং আরিফের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না এমন অভিযোগ কারখানার শ্রমিক কর্মচারী-কর্মকর্তাদের।

২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর থেকে আরিফুল ইসলাম কারখানায় কাজ না করে একদিন এসে পুরো একমাস হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করে বেতন নিচ্ছেন। আগস্ট মাসের হাজিরা খাতা পর্যবেক্ষন করে দেখা যায়, ১৫ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ১ দিন অর্থাৎ পহেলা আগস্ট আরিফ স্বাক্ষর করেছেন। সেইদিন্ও তিনি কোন কাজ করেনি। এক কথায় গত দুই বছর ধরে কাজ না করলেও সিইউএফএল কতৃপক্ষ রহস্যজনক কারণে তাকে পুরো মাসের বেতন ভাতা-ওভারটাইম, ট্যুর ভাতাসহ নানা প্রশাসনিক সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানার এফপিডির অতিরিক্ত প্রধান (রসায়নবিদ) জহিরুল হক অকপটে শ্রমিক আরিফের কর্মস্থলে অনুপস্থিতির কথা স্বীকার করে বলেন,‘ইচ্ছে থাকলেও কিছু করার নেই। তিনি কারখানার অঘোষিত সিবিএ নেতা। তাকে বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সমীহ করেন, ফোন করে খোজ খবর নেন। তিনি আরও বলেন, আরিফের কর্মস্থলে না আসার বিষয়টি আমি কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে বলেছেন, কিছু বিষয় দেখেও না দেখার ভান করতে হয়। তাই অপারগ হয়ে মেনে নিচ্ছি’।

এছাড়া ভুয়া সিবিএ নেতা পরিচয় দিয়ে আরিফ কারখানা কর্তৃপক্ষ থেকে ট্যুরের নামে নিয়মিত টোল ও মোটা অঙ্কের ভাতা আদায় করছেন। সিইউএফএল’ এর সব অফিসিয়াল কাজে আরিফকে ঢাকা বিসিআইসি কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রায় তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উর্ধতন কর্মকতাদের সঙ্গে বিমানে ভ্রমন করতেও দেখা যায়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, কারখানার ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন) উত্তম কুমার দত্ত এই দুর্নীতি-অনিয়ম ঢাকতে সাফাই গেয়ে বলেছেন—”কারখায় বর্তমানে সিবিএ কমিটি নেই, আরিফসহ কয়েকজন, শ্রমিকদের জন্য কাজ করেন, তাই তাদের টোল ভাতা দেওয়া হয়!” একজন সাধারণ শ্রমিক কীভাবে বৈধ কমিটি ছাড়া সরকারি টাকায় ‘ট্যুর’ করেন—সেই প্রশ্ন কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের।

আরিফের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের এখানেই শেষ নয়। গত ২রা মার্চ কারখানার ভিআইপি গেস্ট হাউজ ব্যবহার করে তার জন্মদিন পালন করেছেন। এই ভিআইপি গেস্ট হাউজই যেন হয়ে উঠেছে ’আরিফের হাউস’। যখন তখন তিনি বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে আরিফ দেখাতেন সরকারি দলীয় দাপট। আর সরকার পতনের পর রাতারাতি রঙ বদলে নিজেকে বিএনপির লোক পরিচয় দিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এই বহুরূপী মাস্টার অপারেটর! শুধু কী আরিফুল ইসলাম খোলস বদল করেছে? সিইউএফএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমানও রাতারাতি নিজেকে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে রূপান্তর ঘটিয়েছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সাবেক ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদের পোস্টার হাতে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন!

সিইউএফএলের ব্যাগিং শাখার এমও এ এস এম আরিফুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, শ্রমিকদের কাছে তার জনপ্রিয়তা দেখে একটি বিশেষমহল উদ্দেশ্যমূলক, ভিত্তিহীন, মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছেন।

মাস্টার অপারেটর আরিফুল ইসলামের কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো.মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রশ্ন, দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় চলা একটি রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে এভাবে লুটেপুটে খাওয়া এবং সৎ কর্মচারীদের বলির পাঁঠা বানানোর এই উৎসব আর কতদিন চলবে? সিইউএফএলকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং এমডি মিজানুর রহমান ও ভুয়া সিবিএ নেতা আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন কারখানার সৎ তথা অনিয়ম দূর্নীতির সঙ্গে যুক্ত নন এমন কর্মকর্তা কর্মচারীগণ।

বিএনএনিউজ/শামীমা চৌধুরী শাম্মী

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ