বিএনএ, ঢাকা:রাজনৈতিক ভূমিকম্প কাকে বলে? ২২শে আগস্ট, ২০কোটি মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় আন্ডারগ্রাউন্ড সত্যটি ফাঁস করে দিলেন আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান!
৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পতন হলো, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ চালাল, তারেক রহমান বীরের বেশে দেশে ফিরলেন এবং ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পেল— আপনি ভাবছেন এই সবকিছু খুব স্বাভাবিক নিয়মে হয়েছে? না ! এর আড়ালে পরতে পরতে রহস্য।
সাংবাদিক শারমিন চৌধুরীর ‘পালস অব পলিটিক্স’ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে শামীম ওসমান যে বোমা ফাটিয়েছেন, তাতে কেঁপে উঠেছে নয়াপল্টন থেকে মগবাজার! তাঁর দাবি— আওয়ামী লীগের সমর্থকরা যদি ব্যালট বাক্সে গিয়ে হাত না বাড়াতো, তবে বিএনপি নাকি ৯৫টি আসনেও জামানত বাঁচাতে পারতো না! জামায়াতে ইসলামী আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে থাকতো!
কী সেই পর্দার আড়ালের খেলা? বিএনপি কি আসলেই আওয়ামী লীগের দয়ায় আজ ক্ষমতায়? নাকি এটি শামীম ওসমানের সস্তা রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি?
এবার ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার মহাবিস্ফোরণে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় শেখ হাসিনার ১৫ বছরের অপরাজেয় দুর্গ । দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা । এরপর বাংলাদেশের হাল ধরেন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর অধীনে দেশ যখন সংস্কারের মহাসড়কে, ঠিক তখনই দীর্ঘ নির্বাসন ভেঙে কোটি কোটি কর্মী-সমর্থকের হুঙ্কার নিয়ে বাংলাদেশে পা রাখেন বিএনপির ক্রাউন প্রিন্স তারেক রহমান। ঢাকার রাজপথ সেদিন জানান দিচ্ছিল— পরিবর্তন সুনিশ্চিত। কিন্তু ক্ষমতার এই পালাবদলের নেপথ্যে যে এত বড় একটা ‘কৌশলগত খেলা’ বা স্ট্র্যাটেজিক গেম চলছিল, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সেই বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই, পুরো মাঠ ফাঁকা। সবাই ভেবেছিল বিএনপি একাই ফাঁকা মাঠে গোল দেবে। হ্যাঁ, বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলে অবিশ্বাস্যভাবে ৬৮টি আসন ছিনিয়ে নেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী! আর এখানেই শামীম ওসমান ছুড়ে দিয়েছেন তাঁর সবচেয়ে বিষাক্ত তীরটি! তিনি দাবি করেছেন, এই নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে বা জোটগতভাবে ক্ষমতায় চলে আসতো, যদি না আওয়ামী লীগের কোটি কোটি প্রচ্ছন্ন ভোটাররা বিএনপিকে ‘লাইফলাইন’ দিতো!
শামীম ওসমানের খাস দাবি— আওয়ামী লীগের সমর্থকরা জানতো কট্টর ডানপন্থী জামায়াত ক্ষমতায় আসলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যাবে। তাই জামায়াতকে রুখতে চরম শত্রু বিএনপিকে ভোট দেওয়ার গোপন ও অলিখিত সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগের প্রচ্ছন্ন ভোটাররা।
শামীম ওসমানের ভাষায়— “জামায়াতকে ঠেকাতে আমাদের ভোটাররা কৌশলগতভাবে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। আর সেই ভোটের ওপর ভর করেই বিএনপি অন্তত ৯৫ টির মতো বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় বসে আছে!”
ভাবা যায়? যে বিএনপি ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের তাড়ানি খেয়েছে, আজ শামীম ওসমানের দাবি অনুযায়ী, সেই আওয়ামী লীগের ভোটারদের দয়ায় নাকি বিএনপির ৯৫ জন এমপি সংসদে বসে আছেন!
কিন্তু শামীম ওসমানের শব্দ বোমাবাজি এখানেই শেষ হয়নি! নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ উল্টে দেওয়ার পর তিনি এবার সরাসরি আগামী ডিসেম্বরে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে শামীম ওসমান হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, “ডিসেম্বরে কোনো সাধারণ খেলা হবে না, এবার সরাসরি যুদ্ধ হবে!” আর এই যুদ্ধের পেছনে নাকি রয়েছে পর্দার আড়ালের বড় কোনো শক্তির সবুজ সংকেত! শামীম ওসমান আরও বিস্ফোরক মন্তব্য করে বলেন, ভারতই তারেক জিয়াকে লন্ডন থেকে নিয়ে এসেছে।
এক অবিশ্বাস্য তথ্য দিয়ে শামীম ওসমান বলেন, দেশের দুইজন অত্যন্ত প্রভাবশালী জেনারেলের সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথা হয়েছে। শামীম ওসমানের ভাষ্যমতে, সেই সামরিক কর্মকর্তারা বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁদেরকে ফোনে অত্যন্ত গোপনীয় এক বার্তা দিয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, “আপনারা আর দেরি করবেন না, যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরে আসেন।
শামীম ওসমান, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচায তার ইউটিউব চ্যানেলে বলা দুই বিগ্রেডিয়ার জেনারেলের কথা অস্বীকার করে বলেছেন, আরও উচু লেবেলে সেনা অফিসারের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি দেশের আইন শৃঙ্খলার বিষয়টিও তুলে ধরে সরকারের সমালোচনা করেন।
যেখানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে, সেখানে শামীম ওসমান দাবি করছেন ড. ইউনূসের প্রশাসনের ভেতরে থাকা জেনারেলরাই নাকি তাঁদের দ্রুত দেশে ফেরার তাগিদ দিচ্ছেন! এই দাবি কি শুধুই মাঠ গরম করার ফাঁকা আওয়াজ, নাকি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে সত্যিই বড় কোনো রাজনৈতিক ওলটপালট হতে চলেছে?
আসুন এবার সমীকরণটা মেলাই। নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ৫৪% ভোট আর জামায়াত জোট পেয়েছিল প্রায় ৪০% ভোট। বহু আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েক হাজার ভোটের। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশও মনে করেন, কট্টরপন্থী ইসলামি শাসন এড়াতে প্রগতিশীল বা ধর্মনিরপেক্ষ ভোটারদের একটা বড় অংশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।
কিন্তু শামীম ওসমান যেভাবে সুনির্দিষ্টভাবে ‘৯৫টি আসনের’ দাবি তুলেছেন বা দুই জেনারেলের নাম জড়িয়েছেন, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বিএনপি শিবিরে। বিএনপির দাবি, দীর্ঘ ১৫ বছরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারেক রহমানের নেতৃত্বকে বেছে নিয়েছে, এখানে কোনো দলের প্রচ্ছন্ন দয়া বা দাক্ষিণ্যের প্রয়োজন হয়নি। শামীম ওসমানরা আসলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই এখন বিএনপির ওপর ক্রেডিট নেওয়ার এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিতর্কিত করার এই সস্তা রাজনীতি করছেন।
ইউনূস সরকারের বিদায়, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন, বিএনপির ক্ষমতাসীন হওয়া এবং শামীম ওসমানের এই নতুন যুদ্ধ-ঘোষণা— এই পুরো মহাকাব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করলো।
সৈয়দ সাকিব
![]()

