বিএনএ, ঢাকা: ২০০৬ সালের ২৬শে অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অলি আহমেদ বিএনপি ত্যাগ করেন এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপি গঠন করেন । তখন পদত্যাগী এই নেতার কণ্ঠে ছিল বিদ্রোহের দামামা। তিনি প্রকাশ্যে বিএনপি, বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। যা বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলে দেয় । তাঁর এই পদত্যাগ ও নতুন দল গঠন বিএনপি শাসনের শেষ দিকে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত করতে ভূমিকা রাখে। বিএনপি থেকে পদত্যাগ করার পর এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমেদ কীভাবে বিএনপির চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়া ও তার পুত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সম্মানহানি করেন এই পর্বে তা উল্লেখ করবো। গবেষণামূলক এই পর্বটি শেষ পর্যন্ত দেখার অনুরোধ করছি।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপির আত্মপ্রকাশের দিন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদ তার বক্তৃতায় বলেন, দল গঠনের শুরু থেকে যারা বিএনপির সঙ্গে ছিলেন, আজ দলের ভেতর তারা অবাঞ্ছিত হয়ে গেছেন কারণ তারা জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও নীতির কথা বলতে চান। খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের স্বৈরাচারী নেতৃত্বে বিএনপি আজ অধিক মাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত।
তারেক রহমানের কঠোর সমালোচনা করে অলি আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির গণতান্ত্রিক কাঠামো অবশিষ্ট নেই। এই দলে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। তারেক জিয়া ছাড়া কোনো কাজ হয় না। এমনকি দলের প্রার্থী মনোনয়নও না। অলি আহমেদ আরও বলেন, বিএনপি শহীদ জিয়ার ১৯ দফা ও তার আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে শুধু প্রজেক্ট করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছে। এ কারণে অতি অল্প সময়ে অবিশ্বাস্যভাবে তারা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে।
শুধু বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়ার সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হয়নি বিএনপির স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগী নেতা অলি আহমেদ। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির ক্ষমতার শেষ দিন বারিধারায় পার্টির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সীমাহীন লুটপাটের সঙ্গে জড়িত তারেক রহমানসহ জোট সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে রাষ্ট্রপতির কাছে দাবিও জানান ড. অলি।
তিনি বলেছেন, লাগামহীন দুর্নীতির কারণে বিএনপির অনেক মন্ত্রী-এমপি রাতারাতি অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। অথচ কয়েক বছর আগেও তাদের পায়ের তলায় জুতা ছিল না।
বেগম খালেদা জিয়া কাউকে সম্মান করতে জানেন না বলেও মন্তব্য করেন কর্নেল অলি। ২০০৬ সালের ৩০ শে অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্য, দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী-এমপিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান অলি আহমেদ।
২০০৬ সালে ৩রা নভেম্বর এলডিপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কর্নেল অলি বলেন, দুর্নীতিবাজরা আগামীতে ক্ষমতায় আসতে পারলে পাজেরোর বদলে মার্সিডিজ গাড়ি হাঁকাবে। আবারো দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করবে। এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ড. ইয়াজউদ্দিনের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।
১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ৪ উপদেষ্টার সঙ্গে এক বৈঠকে তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে অলি আহমেদ বলেন, আমরা দুর্নীতিবাজদের লিস্ট দিয়েছি। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এর তিন দিন পর ১৮ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামী-বিএনপি ছাড়া অন্যসব দলকে একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান জানান অলি। তিনি বলেন, লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে বিএনপি-জামায়াত জোটের সময় দ্রব্যমূল্য আকাশ ছুঁয়েছিল।
২০০৬ সালের ২১ নভেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়ায় এলডিপি নেতা কর্নেল অলির জনসভায় দফায় দফায় হামলা হয়। ওই হামলায় নিহত হন ২ জন এবং আহত ১৫ জন। এর পরের দিন ২২শে নভেম্বর চট্টগ্রামে আয়োজিত জনসভায় বিএনপি, খালেদা জিয়া, তারেক-বাবরের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করেন কর্নেল অলি। খালেদা, তারেক ও বাবরকে জেএমবির মদদদাতা উল্লেখ করে অলি বলেন, তারা যদি জঙ্গিবাদ ও জেএমবির মদদদাতা না হতো তাহলে জঙ্গি তৎপরতা এতোদূর আগালো কী করে?
অলি আহমেদ ওই জনসভায় বলেন, ‘আমি খালেদা জিয়াকে বহুবার বলেছি, ৪/৫ জনের জন্য বিএনপি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তারেককে রাজনীতিতে আনবেন না। খালেদা জিয়ার অহঙ্কারের শিক্ষা এবার জনগণ দেবে।
২০০৬ সালের ১৫ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান রাজাকারদের ক্ষমতায় বসিয়েছে অভিযোগ করে কর্নেল অলি বলেন, এদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়। এরা সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে সরকারি অফিসসহ সবকিছুকে দলীয় অঙ্গ সংগঠনে পরিণত করেছে।
২০০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নিজ বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে কর্নেল অলি বলেন, খালেদা জিয়া ও হাওয়া ভবনের নির্দেশে দেশ চালাচ্ছেন ড. ইয়াজউদ্দিন। খালেদা-নিজামীরা দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন চান না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি বাংলাদেশে সেনা-সমর্থিত যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল, তা ইতিহাসে ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে পরিচিত। সেনা সমর্থিত তত্ত্ববধায়ক সরকারকে ক্ষমতাসীন করার ক্ষেত্রে কারিগরদের অন্যতম ছিলেন অলি আহমেদ। তিনি বিএনপির শক্তিশালী নেতৃত্বের বিপরীতে এক ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিলেন এবং সেনাসমর্থিত সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর নবগঠিত দল এলডিপি নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সাথে ঐক্যবদ্ধ হন এবং তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে মহাজোটের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয় এলডিপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে। ফলে মহাজোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচনে যায় এলডিপি। নির্বাচনে ১৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ‘সবেধন নীল মনি’ ড. অলি আহমেদই শুধু চট্টগ্রাম-১৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন থেকে রাজনীতিতে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এলডিপি ও ড. অলি আহমেদ। যার ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

