Bnanews24.com
Home » তালেবানের আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতি
আফগানিস্তান কভার প্রবন্ধ সব খবর

তালেবানের আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতি

আফগানিস্তান দখলের নেপথ্যে তালেবানের ৭ শীর্ষ নেতা

।।ইয়াসীন হীরা।।

২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পেশাজীবীদের যখন-তখন রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ এর বিষয়টি বুঝাতে গিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেছেন ‘গরীবের বউ নাকি হগলের ভাউজ’ (গরীবের বউ সবার ভাবি)’! অসম সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে এ প্রবাদটির বহুল প্রচলন আছে।  গ্রাম এলাকায় একটি চিত্র প্রায়ই দেখা যায়, সেটি হলো ভাবিকে ডাকতে ডাকতে সবাই ঘরে ঢুকে পড়ে!

এর মূল কথা হচ্ছে, প্রতিবেশি ধনী সবসময় গরীবকে চাপে রাখতে চায়! আমার আশ্রয়ে, করুনায় আছো থাকোও চিরদিন। এর যেন ব্যাতিক্রম না হয়। ব্যাতিক্রম হলে কুরুক্ষেত্র ! ৩৪ প্রদেশের আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে এটি শতভাগ প্রযোজ্য। বিভিন্ন  কূট কৌশলে ৩৮,০৪ মিলিয়ন (২০১৯) জনসংখ্যার দেশটি দখল পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে  পরাশক্তিগুলো । নিয়েছেও।

আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা নতুন নয়। দেশটি মূলত বিদেশি সহায়তার ওপর চলছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ৯০ শতাংশ মানুষ সরকারঘোষিত দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।

ভূতাত্ত্বিকেরা জানান, আফগানিস্তানে রয়েছে খনিজ সম্পদের বিপুল ভান্ডার।  লোহা, তামা ও সোনার পাশাপাশি একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় অতিমূল্যবান উপাদান  লিথিয়ামের বিশ্বের সবচেয়ে বড় খনিটি রয়েছে আফগানিস্তানে। লিথিয়াম রিচার্জেবল ব্যাটারি তৈরির মূল একটি উপাদান। এ কারণেই, জলবায়ু সংকট মোকাবিলার এই যুগে এসে খনিজটির চাহিদা আকাশ ছুঁয়েছে! আফগানিস্তানের সব খনিজ সম্পদের মোট মূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এছাড়া ১৯৫০ সাল থেকে  হেরোইন , আফিম উৎপাদন হয় আফগানিস্তানে।  একদিকে মূল্যবান খনিজ সম্পদ, অন্যদিকে মাদক চাষের নিয়ন্ত্রণ নিতেই পরাশক্তি গুলো নানা কূট কৌশলে আফগানিস্তানের সরকারকে নিজেদের পুতুলে পরিণত করেছে।

ইতিহাস সূত্রে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পিডিপিএ আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে এবং নূর মুহম্মদ তারাকী রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। দলটি দেশজুড়ে প্রচলিত ইসলামী মূল্যবোধ ধ্বংস করে কার্ল  মার্কস এর কমিউনিজম শাসন চালু করেন। যা সেখানকার মুসলমানরা মেনে নিতে পারেনি। জনসাধারণ এবং প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কাঠামোর অধিকারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ এর জন্ম দেয়। আফগান সরকার কঠোরভাবে বিরোধিতা দমন করে। হাজার হাজার লোককে গ্রেপ্তার করে এবং প্রায় ২৭,০০০ রাজনৈতিক বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এর প্রতিক্রিয়ায় অনেকগুলো সরকারবিরোধী সশস্ত্র দল গঠিত হয় এবং ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে আফগানিস্তানের বড় একটি অংশ জুড়ে বিদ্রোহ দেখা দেয়। তদুপরি, আফগান সরকার অন্তদ্বন্দ্বের কারণে অস্থিতিশীল ছিল।১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে হাফিজুল্লাহ আমিনের সমর্থকেরা তারাকীকে ক্ষমতাচ্যুত করে আমিনকে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করে।

এ অবস্থায় ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে নেয়। সোভিয়েত সৈন্যরা একটি অভ্যুত্থানের নাটক করে রাষ্ট্রপতি আমিনকে হত্যা করে এবং একটি প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলের সদস্য সোভিয়েতপন্থী বাবরাক কারমালকে ক্ষমতায় বসায়।

জনসাধারণ এবং প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কাঠামোর অধিকারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ এর জন্ম দেয়। আফগান বিদ্রোহীরা প্রতিবেশী পাকিস্তান ও চীনে সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরীয় আরব রাজ্যগুলো থেকে বিপুল আর্থিক সহায়তা পায়।

সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে ২০ লক্ষ আফগান প্রাণ হারায়

সোভিয়েত সেনাদের সঙ্গে আফগানিস্তান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং আফগান মুজাহিদদের গেরিলা যুদ্ধ চলে ১০ বছর। এই যুদ্ধে প্রায় ৬ থেকে ২০ লক্ষ আফগান প্রাণ হারায়, যাদের অধিকাংশই ছিল বেসামরিক নাগরিক।সোভিয়েত  সেনাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষাপটে ১৯৮৭ সালের মাঝামাঝিতে সংস্কারপন্থী নেতা মিখাইল গর্বাচেভের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত সরকার আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তান থেকে  সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

ওসামা বিল লাদেন সোভিয়েতের পরে মার্কিন বিরোধীও হয়ে ওঠে

অপর পরাশক্তি মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্র আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেনা প্রবেশের পর থেকে এর বিরোধীতায় করতে  থাকে।  সৌদি আরবের এক বিত্তশালী  ঠিকাদার মোহাম্মদ বিন লাদেনের ৫২ জন ছেলেমেয়ের মধ্যে ১৭তম  ওসামা বিন লাদেনকে কমিউনিস্ট বিরোধী দিক্ষা দিয়ে আফগানিস্তানে পাঠায়। ওসামা বিল লাদেন তার প্রতিষ্ঠানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে ‘মুজাহিদ’ গঠন করে সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে লিপ্ত হন। পরবর্তীতে লাদেন সোভিয়েত বিরোধীতার পাশাপাশি মার্কিন বিরোধীও হয়ে ওঠেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

১৯৯৬ সালে ওসামা বিল লাদেনের অনুসারি তালেবান আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন হন। আফগানিস্তান ইসলামি আমিরাত প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ারের  হামলার পর  ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক বাহিনী অভিযান চালায়। এতে ক্ষমতাচ্যুত হয় তালেবান সরকার। প্রায় ২০ বছর মার্কিন সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় ছিল আফগানিস্তানে। ২০২১ সালের ১৫ আগষ্ট প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির পলায়নের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তান ফের তালেবানের দখলে চলে যায়। যদিও গত ২৬  অগাস্ট কাবুল বিমানবন্দরে বিধ্বংসী আত্মঘাতী হামলা থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তালেবানের বিজয়ে আফগানিস্তানে তৎপর অন্য কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী খুশি নয় এবং সেটা তারা প্রকাশও করছে।

ভারতকে  ‘মোড়ল’ হিসাবে দেখতে চায় না পাকিস্তান ও চীন

কেন এমনটা হলো?  টিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন এটি। আফগানিস্তান থেকে যেভাবে সাবেক  সোভিয়েত ইউনিয়ন পালিয়ে এসেছে, ঠিক সেভাবে পালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র! আর নেপথ্য রয়েছে পাকিস্তান, রাশিয়া, চীন, ইরান, তুরস্ক এবং পশ্চিমা কিছু দেশ। ভূ-রাজনীতির এ খেলা নতুন করে শুরু হয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের পতনে মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্রের পর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশটি হচ্ছে ভারত। পাকিস্তান ও চীন ভারতকে মধ্য এশিয়ায় কখনো নতুন ‘মোড়ল’ হিসাবে দেখতে চায় না। সে কারণে মস্কো থেকে বেইজিং, বার্লিন থেকে ইসলামাবাদ -আফগানিস্তান নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা এখন প্রবল।

চীন-পাকিস্তানের কৌশলগত কূটনীতি

আফগানিস্তানে চীনের যেমন অর্থনৈতিক অভিলাষ রয়েছে, সেই সাথে চীনের নিরাপত্তার জন্যও আফগানিস্তান গুরুত্বপূর্ণ । তালেবান ক্ষমতায় আসীন হওয়ার নৈপথ্য রয়েছে চীন-পাকিস্তানের কৌশলগত কূটনীতি। চীন পাকিস্তানের মাধ্যমে তালেবানদের সব ধরনের সহযোগিতা করেছে। বিষয়টি টের পেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এর পরিণতি এড়াতে তালেবানের সঙ্গে  ২০২১ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি তালেবান- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  কাতারের রাজধানী দোহায় একটি সমঝোতা চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুয়ায়ি ২০২১ সালের পহেলা মে থেকে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে। এ অবস্থায় তালেবান বিভিন্ন প্রদেশ দখল করতে থাকে। এতে বিপদে পড়ে যায় গনি সরকার। আমেরিকার সেনা প্রত্যাহার শেষ করার আগেই কোন প্রতিরোধ ছাড়া তালেবান কাবুল দখল করে নেয়।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চলে যাওয়ার পর চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদে হাত দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মাইক্রোচিপ সহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যবহার হয় এমন লিথিয়ামের ওপর চীনের নজর রয়েছে। চীনের বেসরকারি খাত আফগানিস্তানের বাজার নিয়ে খুবই উৎসাহী।

তারা মনে করছে, আফগানিস্তানে বাণিজ্যের হাজারো রকমের সুযোগ রয়েছে। কৌশলগত দিক থেকে আফগানিস্তানে ‘সিল্ক রোড’ নামে এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত প্রাচীন যে স্থল বাণিজ্য রুটটি পুনরুদ্ধারে চীন বদ্ধপরিকর। আফগানিস্তান সেই রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে আফগানিস্তানে আঞ্চলিক ইসলামি উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে চীনেরও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে উইগুর মুসলিম অধ্যুষিত শিনজিয়াংয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে চিন্তিত বেইজিং।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনের সঙ্গে আফগানিস্তানের সীমান্ত মাত্র ৯০ কিলোমিটার। তালেবান নেতা মোল্লাহ বারাদার চীন সফরে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আফগানিস্তানের ভূমি ব্যবহার করে চীনের বিরুদ্ধে কাউকে তৎপরতা চালাতে দেয়া হবে না। তারপরও বেইজিংবিরোধী উগ্র ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীরা আফগানিস্তানকে ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করতে পারে এমন সম্ভাবনা নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন।

উল্লেখ, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট আফগান পরিস্থিতি নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেন। টেলিফোন আলাপে চীন ও রুশ নেতা “আফগানিস্তান থেকে সন্ত্রাস এবং মাদকের হুমকি মোকাবেলায়” তৎপরতা বাড়াতে একমত হন।

পাকিস্তানে আফগান শরণার্থীর সংখ্যা ৩০ লাখ

আফগানিস্তানে সরকার ব্যবস্থা পাকিস্তানের রাজনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। যদিও  তালেবানকে সাহায্য করার কথা পাকিস্তান সবসময় অস্বীকার করে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে কাবুলে তাদের ক্ষমতা দখলের পর যে তিনটি দেশ তাদের স্বীকৃতি দিয়েছিল পাকিস্তান ছিল তাদের অন্যতম। আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের ২৪০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। পাকিস্তানে আফগান শরণার্থীর সংখ্যা ৩০ লাখ।  চীন পাকিস্তানের মাধ্যমে আফগানিস্তান থেকে ভারতকে বিতাড়িত করতে চায়। তার ধারাবাহিকতায় তালেবান সরকার এর মধ্যে ভারতীয়দের ভয় দেখিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে।

ভারতকে বিচ্ছিন্নতাবাদি গোষ্ঠীর উস্কানিদাতা মনে করে পাকিস্তান

ব্রিটেনের গবেষণা সংস্থা রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইন্সটিটিউটের (রুসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে,  তালেবানের ক্ষমতা দখলে আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব কমবে। বিশেষ করে জালালাবাদ এবং কান্দাহারের মত সীমান্তবর্তী আফগান শহরগুলোতে ভারতের কনস্যুলেটগুলো নিয়ে পাকিস্তান খুবই উদ্বিগ্ন ছিল।ইসলামাবাদ  মনে করে, ভারত উত্তরে পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠী তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং দক্ষিণে বালুচ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদি গোষ্ঠীর প্রধান উস্কানিদাতা, এবং আফগানিস্তানের এসব ভারতীয় কনস্যুলেটের মাধ্যমে এসব বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে নানা সাহায্য সহযোগিতা করা হতো। ইসলামাবাদ  বিশ্বাস করে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তানে তারা তাদের প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে পারবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের ব্যবসা-বানিজ্য সম্প্রসারণ হবে।

উল্লেখ, আফগানিস্তানের প্রধান ব্যবসা-বাণিজ্য হয় পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে। আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে একটি বাণিজ্য করিডোর তৈরি নিয়েও পাকিস্তান খুবই আগ্রহী।পাকিস্তানের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণেও বিভিন্ন ইস্যুতে বিশেষ করে নিরাপত্তার ইস্যুতে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী হবে তালেবান। তালেবানের সরকার বিশ্বে একঘরে হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থায় পাকিস্তান এবং চীনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তারা যেতে পারবে না।

মস্কো চিন্তিত যে বিষয়ে

মধ্য এশিয়ায় ভূ-রাজনীতি ও আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের ওপর নজর আছে রাশিয়ার। যদিও আফগানিস্তানে ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত দশ বছর ধরে আগ্রাসন চালিয়েছিল সাবেক  সোভিয়েত ইউনিয়ন। সাবেক সোভিয়েত এসব দেশ – উজবেকিস্তান, তাজিকস্তান, তুর্কমেনিস্তানের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক এখনও ঘনিষ্ঠ। এ অবস্থায় রাশিয়ার ককেশাস অঞ্চলের জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর আফগানিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া নিয়ে মস্কো সবচেয়ে বেশি চিন্তিত।

ইসলামিক স্টেট রাশিয়া এবং তালেবান উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক

বিশেষ করে ইসলামিক স্টেটের সাথে সম্পর্কিত এসব জিহাদি সংগঠনগুলো রাশিয়া এবং তালেবান উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক। ফলে, রাশিয়া বেশ কিছুদিন ধরেই তালেবানের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করেছে। সামগ্রিকভাবে, যে অঞ্চলটিকে রাশিয়া তাদের প্রভাব বলয়ের অংশ বলে বিবেচনা করে সেই মধ্য এশিয়া থেকে আমেরিকানদের চলে যাওয়া মস্কোর জন্য জন্য বড় একটি স্বস্তি।

মধ্য এশিয়ার ভূ – রাজনৈতিক স্বার্থে  ইরান আফগানিস্তানের তালেবানকে সহযোগিতা করার বিষয়টি ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’। ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি  মোল্লাহ বারাদারের নেতৃত্বে তালেবানের একটি প্রতিনিধি তেহরান সফরে যান। ইরান তালেবানের নেতাদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেছে। তাদের মধ্যে  রাজনৈতিক নানা বিষয়ে আলোচনা হয়।  তাদের টাকা পয়সা এবং অস্ত্রও দিয়েছে। বদলে, তালেবান এখন আফগান শিয়াদের ব্যাপারে, বিশেষ করে শিয়া হাজারা জাতিগোষ্ঠীর ব্যাপারে অনেক নরম। যে কারণে হাজারা অধ্যুষিত মধ্য আফগানিস্তানে তালেবান একটিও গুলি না ছুঁড়েই দখল করে নিয়েছে।

অভিযোগ আছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর কুদস্‌ ফোর্স তালেবানদের অস্ত্র ও ট্রেনিং দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সন্ত্রাসী একটি বাহিনী হিসাবে বিবেচনা করে।

আফগানিস্তানে তালেবান সরকার গঠনে  ইরানের প্রভাব রয়েছে। আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতায় ইরানের স্বার্থ রয়েছে, কারণ তাতে সেদেশে আফগান শরণার্থীর চাপ কমবে। জাতিসংঘের হিসাবে ইরানে বর্তমানে ৭ লাখ ৮০ হাজার আফগান শরণার্থী রয়েছে। এছাড়া খনিজ সম্পদ উত্তোলনে ইরান অংশিদার হতে তৎপর রয়েছে।

পশ্চিমা নেতারা আফগানিস্তানের তাদের ২০ বছরের সামরিক তৎপরতাকে একটি সাফল্য হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করছেন এবং করবেন। আফগানিস্তানে তাদের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে তা পুনরুদ্ধারে আমেরিকা এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের বেশ কিছুটা সময় লাগবে। আমেরিকা এবং তালেবানের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে তাতে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালাতে কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী যেন আফগানিস্তানকে ব্যবহার না করতে পারে তালেবান তা নিশ্চিত করবে, কিন্তু সেই ভরসা পশ্চিমারা করতে পারছে না। গত ২৬ আগষ্ট কাবুল বিমান বন্দরে হামলার ঘটনা প্রমাণ করে এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আফগানিস্তানে তৎপর।

কাবুল বিমানবন্দরে বৃহস্পতিবারের সন্ত্রাসী হামলা আরো প্রমাণ করে যে, আফগানিস্তানে তালেবানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সেদেশে তৎপর বিভিন্ন বিদ্রোহী এবং উগ্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তির ভারসাম্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।আইএস দ্বারা উদ্বুদ্ধ বিভিন্ন গোষ্ঠী নতুন করে সংগঠিত হতে পারে এমনটা মনে করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে আফগানিস্তানে এখন আল কায়েদার অবস্থান সংহত হতে পারে। ২০ বছর পর আল কায়েদা নেতারা আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছে। আগে থেকেই নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশটিতে তালেবানের শাসন রাজনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

লিথিয়ামের সবচেয়ে বড় মজুত আফগানিস্তানে

জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন প্রতিরোধ করতে প্রয়োজন কার্বন নিঃসরণ কমানো। এ জন্য জোর দেওয়া হচ্ছে ইলেকট্রিক গাড়ি এবং কার্বন নিঃসরণ কম হয়, এমন প্রযুক্তির ওপর। এ কাজে যে পদার্থগুলো প্রয়োজন তার মধ্যে রয়েছে লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিওডিমিয়াম। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানায়, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় লিথিয়াম, তামা, নিকেল, কোবাল্টসহ নানা পদার্থের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এই মুহূর্তে বিশ্বের ৭৫ শতাংশ লিথিয়াম, কোবাল্টসহ দুর্লভ খনিজগুলোর চাহিদা মেটাচ্ছে চীন, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও অস্ট্রেলিয়া। এখন পর্যন্ত লিথিয়ামের সবচেয়ে বড় মজুত রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায়। মার্কিন সরকারের হিসাব বলছে, আফগানিস্তানের লিথিয়ামের পরিমাণ বলিভিয়াকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) জানায়,  আফগানিস্তানে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীল  পরিস্থিতি বজায় থাকে এবং এ সময়ে যদি দেশটিতে খনিজ উত্তোলন ব্যবস্থার উন্নতি করা যায়, তাহলে আফগানিস্তান এক দশকের মধ্যে এই অঞ্চলের অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হবে।

তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাও তালেবানের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী সংস্থার তকমা দেয়নি, তবে মার্কিন রাজস্ব বিভাগের ‘বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসীর’ তালিকায় তালেবানের নাম রয়েছে। এতে বিনিয়োগ পেতে সমস্যার মুখে পড়তে পারে তালেবান। দেশটিতে নিরাপত্তার অভাব, খনিজ উত্তোলনে সক্ষমতার অভাব এবং একের পর এক খরার মতো কারণগুলো। তালেবানের অধীনেও এ পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। তবে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, বিপুল খনিজ সম্পদ উত্তোলনে চীন, পাকিস্তান, ইরান, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক কূট কৌশলের লড়াই শুরু হবে অল্প কিছু দিনের মধ্যে।তাতে আফগানিস্তানকে নিয়ে হতে পারে নানা সমীকরণ।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)