বিএনএ, ঢাকা : ২০০৮ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপাসন তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছেন। ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত সরকার এবং পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আমলে দায়ের করা বেশ কয়েকটি মামলায় মৃত্যুদন্ড ও যাবতজীবন কারাদন্ড হয়। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার সরকারের পতন হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সাজা থেকে তিন খালাস পান। এখন তার বিরুদ্ধে কোন মামলা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেই।
কিন্তু জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা তার মা বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়াকে এক নজর স্বশরীরে দেখতে দেশে আসতে পারছে না তারেক রহমান। কেন তিনি দেশে আসতে পারছেন না তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন মিষ্টার রহমান নিজে। গত ২৯ শে নভেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল পৌনে ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া আবেগময- হৃদয় স্পর্শী এক পোস্টে দেন।
তারেক রহমান লিখেন, ‘সংকটকালে মায়ের স্নেহ–স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি এ–ও বলেছেন, এখনই দেশে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তাঁর জন্য অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’।
কেন ‘এখনই দেশে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তাঁর জন্য অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’ বলেছেন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপাসন। এটি এখন ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন? এই প্রতিবেদনে সেই প্রশ্নের উত্তর খোজার চেষ্টা করা হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপাসন তারেক রহমান দেশে আসলে বিএনপির গণজোয়ার তৈরি হবে। গণ জরিপ বলছে আওয়ামী লীগ বিহীনবিহীন এই নির্বাচনে দুইশত আসনের বেশী আসনের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করবে সরকার। যেহেতু বেগম জিয়ার শারীরিক সক্ষমতা নেই সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী হবেন তারেক রহমান।
বিশ্ব মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্থান দূর প্রতিবেশী চীন তারেক জিয়ার নেতৃত্বকে মেনে নিতে পারছেন না। তার পিছনে রয়েছে দেশগুলোর নিজ নিজ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর ইমদাদুল ইসলাম ‘পালস অব পলিটিক্স’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানের দেশে না ফেরার জন্য ৪টি দেশের বাঁধার কথা উল্লেখ করেন।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ভারত। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ২০০১-২০০৬ সালে ক্ষমতায় থাকার সময় যেসব ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন এবং সরকারের মধ্যে প্রবল অস্বস্তি তৈরি করেছিল তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ১০ ট্রাক সমপরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আটক করা হয় ২০০৪ সালের পহেলা এপ্রিল রাতে। দুটি বড় ট্রলারে করে এসব অস্ত্র সমুদ্রপথে আনা হয় চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার বা সিইউএফএল জেটিতে।
পর্যবেক্ষকদের অনেকই মনে করেন, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের সেই ঘটনা ভারতের সাথে তৎকালীন বিএনপি সরকারের মধ্যে শীতল সম্পর্কের সূচনা করেছিল। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ভারত সরকার অস্ত্র চালানটি বিষয়ে অবহিত হন। ভারতের চাপে পড়েই বিএনপি সরকার সেসব অস্ত্র আটক করে। অন্যথায় সেসব অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফার হাতে যেত। অস্ত্র চালানটি ধরা পড়ার পর তৎকালীন স্বরাস্ট্রমন্ত্রী লৎফুজ্জামান বাবর হেলিকাপ্টারে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ হেডকোয়াটারে আসেন। অস্ত্র পরিদর্শন শেষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিলেন, যারা এই অস্ত্র চালানটি এনেছে তারা জনগণের শত্রু।
ভারত মনে করে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ফের ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশে উগ্র সন্ত্রাসীর ঘাঁটি হবে। এই সব সন্ত্রাসীরা সেভেন সিস্টার খ্যাত অরুণাচল , আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা রাজ্যে অস্থিশীল করতে পারে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এক সময় পাকিস্তানের সঙ্গে বিএনপির সু-সর্ম্পক থাকলেও এখন তা নেই। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে জামায়াত ইসলামী ও অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার।
জুলাই গণ-অভ্যত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে। বিএনপি ক্ষমতাসীন হলে পাকিস্থান গত ১৬ মাসে যে বলয় তৈরি করেছে সেটি ভেঙ্গে যাবে। দলটি ভারতের সঙ্গে সর্ম্পক উন্নয়নের চেষ্টা করবে। সেকারণে বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না পাকিস্থান। তাছাড়া দেশটি ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার্থে কাজ বেশি আগ্রহী।
গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। এই সময়ে বাংলাদেশের সাথে চীনের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কও ছিল বেশ ইতিবাচক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সাথে চীনের প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। যে কারণে চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
গত বছরের অগাস্টে বাংলাদেশে গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় চীন সফর করেছে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির বেশ কয়েকটি প্রতিনিধি দল। তারা চীনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।
ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চীন ভারত এখন আগের মতো তিক্ততা নেই। তাছাড়া চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সর্ম্পক গভীর। রাশিয়ার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সর্ম্পক আরও গভীর। রাশিয়া ও চীন চায় বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ফিরে আসুক। সেই দিক থেকে চীন রাশিয়া বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ক্ষমতাসীন দেখতে চায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির সবচেয়ে বড় বাধা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের ক্ষমতাধর এই দেশটি তারেক রহমানের বিষয়ে ২০০৮ সালের দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টায়নি।
২০০৮ সালের তেসরা নভেম্বর তারেক জিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দিতে ওয়াশিংটনে গোপন তারবার্তা পাঠিয়েছিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির পাঠানো ওই তারবার্তায় বলা হয়, দূতাবাস মনে করে, রাজনৈতিকভাবে সংঘটিত ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতির জন্য তারেক রহমান দায়ী। তার দুর্নীতির কারণে মার্কিন ঘোষণাপত্রে বর্ণিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তার লক্ষ্য বিনষ্ট হওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে। তারেককে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশের পেছনে যুক্তিও তুলে ধরা হয় বার্তায়।
তবে তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও তাদের মেয়ে জাইমা বা তারেকের মা খালেদা জিয়ার ওপর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা যেন আরোপ করা না হয়, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনকে পরামর্শ দেয় মার্কিন দূতাবাস। বিশ্বে সাড়া-জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস তারবার্তাটি ফাঁস করে।
রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির তার বার্তায় বলা হয়, তারেকের বেপরোয়া দুর্নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র মিশনের লক্ষ্যগুলোও ব্যাপকভাবে হুমকিতে পড়েছে। ঢাকা দূতাবাসের বাংলাদেশের জন্য তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার রয়েছে। গণতন্ত্রায়ন, উন্নয়ন ও সন্ত্রাসীদের জায়গা না দেওয়া। তারেকের দুর্নীতিতে তিনটি লক্ষ্য অর্জনই বিঘি্নত হয়েছে। তার অর্থ আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি ও বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের কারণে আইনের শাসন ব্যাহত হয়েছে এবং স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যকে হুমকিতে ফেলেছে।
তারবার্তায় আরও বলা হয়, একটি মামলায় তারেক আল আমিন কনস্ট্রাকশনের মালিক আমিন আহমেদকে হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দেড় লাখ ডলার না দিলে তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। রেজা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মোহাম্মদ আফতাব উদ্দীন খান, মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের মীর জহির হোসেন ও হারুন ফেরদৌসীসহ অন্য অনেক স্থানীয় ব্যবসায়ী তার বিরুদ্ধে কয়েক মিলিয়ন ডলারের চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন।
তার বার্তায়, আরও বলা হয় বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের ছেলে সানভীর সোবহানকে একটি হত্যা মামলা থেকে ‘রক্ষায়’ ২১ কোটি টাকা ঘুষ নেন তারেক রহমান। বসুন্ধরা গ্রুপের পরিচালক হুমায়ুন কবীর হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে একজন ছিলেন সানভীর। এ হত্যা মামলা থেকে সানভীরকে রেহাই দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তারেক ওই অর্থ নেন বলে দুদকের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
মার্কিন দূতাবাস বলেছে, তারেকের দুর্নীতি শুধু স্থানীয় কোম্পানির কাছে চাঁদাবাজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দুদকের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অনেক ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
দূতাবাস বলেছে, সিমেন্সের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন তারেক ও তার ভাই কোকো। ঘুষ দেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত একজনের সাক্ষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সিমেন্সের সব চুক্তির ক্ষেত্রে তারেক প্রায় ২ শতাংশ ঘুষ নিয়েছেন।
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য চীনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘হার্বিন’ তারেক রহমানকে সাড়ে সাত লাখ ডলার দেয়। তারেকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু এই ঘুষের অর্থ নিয়ে তা সিঙ্গাপুরে সিটিব্যাংকে রাখেন। মোনেম কনস্ট্রাকশন একটি কার্যাদেশ পেতে তারেক রহমানকে সাড়ে চার লাখ ডলার দেয় বলে মার্কিন দূতাবাসের তার বার্তায় উল্লেখ করা হয়।
রাজেনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমান ফিরে না আসা সঙ্গে পরাশক্তিগুলোর বিশেষ করে মার্কিন ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। তারা তারেক জিয়ার সামনে চীনের সেই Great Wall তৈরি করে রেখেছে। যার ফলে মৃত্যুশয্যায় থাকা মাকেও দেখতে আসতে পারছে না। আর এর মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হবে ২০০৮ সালের সেনা সমর্থিত সরকারের ‘মাইনাস ফোর’ তত্ত্ব। যদিও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, দেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি যে ‘মাইনাস ফোর’ তত্ত্ব ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা আসলে স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বীদেরই তৈরি করা ধারণা। তাঁর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার কখনোই এ ধরনের কোনো প্রস্তাব বা আলোচনা করেনি।
বিএনএনিউজ/সৈয়দ সাকিব
![]()
