25 C
আবহাওয়া
৮:০৪ অপরাহ্ণ - জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » লালখাঁন বাজারে বিকাশ এজেন্টে প্রতারণা – প্রতারক পরিচয়পত্র রেখে চম্পট!

লালখাঁন বাজারে বিকাশ এজেন্টে প্রতারণা – প্রতারক পরিচয়পত্র রেখে চম্পট!


বিএনএ, চট্টগ্রাম:  এক সেনা সদস্য পরিচয়ে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানাধীন লালখাঁন বাজারের একটা বিকাশ এজেন্ট হতে মোবাইল ব্যাংককিং নগদে ১৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ৩০ নভেম্বর খুলশী থানার লালখাঁন বাজার এলাকার হাইওয়ে প্লাজায় অবস্থিত ‘বর্ণা লেডিস টেইলার্স অ্যান্ড বিকাশ মোবাইল সার্ভিস’ দোকানে এ প্রতারণার ঘটনা ঘটে। ঘটনার ভিডিও প্রমাণ দোকানের সিসিটিভিতে স্পষ্টভাবে ধরা আছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী দোকানদার।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সিএমপি খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম। এ ঘটনায় প্রতারণার শিকার দোকান মালিক প্রদীপ সরকার ১ ডিসেম্বর রাতে খুলশী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির নম্বর—১৭।

ভুক্তভোগীর বর্ণনা অনুযায়ী খুলশী থানার ডিউটি অফিসার মোহাম্মদ আসাদুল হক জিডিটি প্রস্তুত করেন। বর্তমানে তদন্ত চলছে খুলশী থানার এসআই মো. বাবুল মিয়ার তত্ত্বাবধানে।

জিডি ও সূত্র অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যা ৫টা ৮ মিনিটে এক অজ্ঞাত যুবক লালখাঁন বাজারের হাইওয়ে প্লাজায় ‘বর্ণা লেডিস টেইলার্স অ্যান্ড বিকাশ মোবাইল সার্ভিস’ দোকানে প্রবেশ করেন। এরপর তিনি দোকানদারকে অনুরোধ করেন তার একটি মোবাইল নগদ অ্যাকাউন্টে ১৪ হাজার টাকা পাঠাতে। দোকানদার সরল বিশ্বাসে প্রদত্ত নম্বর (০১৯৭৬২১৯৩৫৪) থেকে টাকার অঙ্ক প্রতারকের নম্বরে পাঠিয়ে দেন।

অজ্ঞাত যুবক টাকা পাঠানোর পর কোনো ক্যাশ প্রদান না করে দ্রুত চলে যান। যাওয়ার সময় তিনি জানান, তিনি সেনাবাহিনীর সদস্য। এ কথা শুনে দোকানে থাকা মালিকের আত্মীয় মাইন উদ্দিন বলেন, “তাহলে সেনাবাহিনীর পরিচয়পত্র দেখান।” এরপর ওই যুবক একটি সেনাবাহিনী আইডি কার্ড প্রদর্শন করেন। সে পরে বলে দেন—“পরে এসে টাকা দিয়ে কার্ডটি নিয়ে যাব।” অর্থাৎ পরিচয়পত্রটি দোকানে রেখে দ্রুত চলে যান।

দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ না পাওয়া ও ফেরত না আসায় দোকানদার নিশ্চিত হন যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং দ্রুত খুলশী থানায় জিডি করেন। পুলিশ বর্তমানে ঘটনার তদন্ত করছে।

ঘটনাটির অনুসন্ধানে এবং কথিত সেনা সদস্যের দেওয়া পরিচয়পত্রের বিশ্লেষণে জানা গেছে—পরিচয়পত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় সবুজ রঙের কার্ডে ইংরেজিতে লেখা Bangladesh Army, নাম মো. মিরাজুল ইসলাম, পদবি সৈনিক। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় রয়েছে কিউআর কোড ও বারকোড।

বারকোড আলাদা লাইনে লেখা হলেও সরকারি সেনাবাহিনীর ডেটাবেইস ছাড়া ১০০% আসল বা নকল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে কার্ডের ফরম্যাট ও স্ট্রাকচার দেখে এটি বাস্তবসম্মত মনে হয়। কিউআর কোড ঝাপসা ও আর্টিফ্যাক্টযুক্ত, তবে ত্রিভুজাকৃতির তিনটি বড় স্কয়ার প্যাটার্ন, ঘনত্ব ও এনক্রিপ্টেড ডেটার গঠন বোঝা যায়। ছবির ফোকাসের কারণে ডিকোড করা সম্ভব হয়নি। তবে এটি নকল প্রমাণ নয়, শুধুমাত্র ছবির মান কম হওয়ার কারণে শনাক্ত করা যায়নি।

সেনা পরিচয়পত্রের মেশিন রিডেবল জোন (MRZ) বিশ্লেষণে দেখা গেছে—প্রথম লাইনে “P” দ্বারা ডকুমেন্ট টাইপ, “BGD” দ্বারা দেশের কোড বাংলাদেশ নির্দেশ করা হয়েছে। কার্ডধারীর নাম লেখা রয়েছে মো. মিরাজুল ইসলাম এবং পদবি সৈনিক। পরবর্তী লাইনে জন্মতারিখ ১৯৯৭ সালের ২০ ডিসেম্বর, জাতীয়তা বাংলাদেশ। কার্ডটি ইস্যু করা হয়েছে ২০২১ সালের ২০ মার্চ, সেনা আইডি নম্বর ১৪৫৩৩৪০, রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ, এবং লিঙ্গ পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত।

কার্ডের গঠন ও স্মার্ট চিপের উপস্থিতি দেখে এটি বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে। যদিও ছবি লো-কোয়ালিটি ও কিউআর কোড ঝাপসা হওয়ায় উচ্চমানের যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতি সাধারণত প্রতারণায় ব্যবহৃত হারানো বা চুরি হওয়া আইডি কার্ডের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ওই যুবক মোবাইল নগদে ১৪ হাজার টাকা নেওয়ার জন্য যে সিম ব্যবহার করেছেন, তা তার নিজের নামে নিবন্ধিত। যুবকের নাম মো. মিরাজুল ইসলাম, রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলার চেরাডাঙ্গী এলাকার হাজেরাপুবু গ্রামের মৃত মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ছেলে।

ঘটনার পর রাতেই প্রতারকের লোকেশন ওয়াসা মোড় এলাকায় ধরা পড়ে। পরের দিন পরিচয়পত্রের সূত্র ধরে দিনাজপুর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (প্রাক্তন সচিব) এ কে এম আসাদুজ্জামান ওই এলাকার ইউপি সদস্য শামশু উদ্দিন ও একই গ্রামের মহিলা গ্রাম পুলিশ কুমকুম আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর প্রদান করেন।

গ্রামের বাড়িতে যোগাযোগ করে প্রতিবেদক আরও জানতে পারেন, মিরাজুল ইসলাম সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত। প্রায় দেড় বছর আগে তার চাকরি চলে গেছে। এর পর নানা প্রতারণার অভিযোগে তিনি সিলেটে ৯ মাস কারাভোগ করেছেন।

দুই মাস আগে চট্টগ্রাম জেলা কারাগার থেকেও তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে, তার ছোট ভাই সিরাজুল ইসলাম জানান, এ সময়ে তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো প্রতারণার মামলা হয়নি। তবে বিষয়টি তারা যাচাই-বাছাই করে দেখছেন।

মিরাজুল ইসলাম সেনাবাহিনীতে মোট ৮ বছর সৈনিক হিসেবে চাকরি করেছিলেন। বর্তমানে বিবাহিত এবং এক ছেলে সন্তানের জনক। তবে ব্যক্তিগত কারণে তার স্ত্রী পিতার বাড়িতে থাকছেন। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন দিনাজপুর সদর উপজেলার চেরাডাঙ্গী এলাকার হাজেরাপুবু গ্রামের ইউপি সদস্য শামশু উদ্দিন ও মহিলা গ্রাম পুলিশ কুমকুম আক্তার।

তার ছোট ভাই সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, মিরাজুলের নানা প্রতারণার কারণে পিতা অতিষ্ঠ । তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ৩০–৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তা শোধ করেননি। পরবর্তীতে পিতাকে তা পরিশোধ করতে হয়েছে। এ কারণে তার পিতা স্ট্রোকজনিত রোগে মারা যান। সিরাজুল ও কুমকুম আক্তার আরও জানান, চট্টগ্রামে একই কায়দায় প্রতারণার ঘটনা ঘটানোর তথ্যও তারা পেয়েছেন।

ভুক্তভোগী দোকান মালিক প্রদীপ সরকার বলেন, “আমি থানায় জিডি করার পর নগদ হেল্পলাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। প্রতারকের একাউন্টে টাকা থাকলে স্থগিতের ব্যবস্থা চাওয়া হয়েছে।”

খুলশী থানার এসআই মো. বাবুল মিয়া জানান, পুলিশ সময় সীমিত হলেও সকল জিডি ও অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রয়োজন হলে নগদ হেল্পলাইনের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রতারককে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীর জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।

ওসি শাহীনুর আলম বলেন, “বিকাশের দোকান থেকে প্রতারণার ঘটনা তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। পুলিশ ভুক্তভোগীকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।”

চট্টগ্রাম কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ইন্সপেক্টর আফতাব হোসেন জানান, ‘বিকাশ প্রতারককে ধরা বেশ কঠিন। তারা এক জেলা থেকে টাকা হাতিয়ে অন্য জেলায় ক্যাশ আউট করে থাকে। এজন্য ভুক্তভোগীদের দ্রুত সেবা প্রদানে পুলিশকে অতিরিক্ত সময় ও চেষ্টা প্রয়োজন হয়।’
বিএনএ/শাম্মী

Loading


শিরোনাম বিএনএ