‘দ্য এক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ (২০১৯) চলচ্চিত্রটি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বকালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নির্মিত একটি পলিটিক্যাল মুভি। এটি মনমোহন সিংয়ের তৎকালীন মিডিয়া উপদেষ্টা সঞ্জয় বারু-র লেখা একই নামের বিতর্কিত বই অবলম্বনে তৈরি।

মুভিটি শুরু হয় ২০০৪ সালের নির্বাচনের পর, যখন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী নিজে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে ড. মনমোহন সিংকে (অভিনয়ে অনুপম খের) এই পদের জন্য মনোনীত করেন। মুভিতে দেখানো হয়েছে, মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেও সরকারের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ বা ‘চাবি’ ছিল কংগ্রেস হাইকমান্ড তথা সোনিয়া গান্ধীর হাতে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশও কি একজন ‘এক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ দেখতে যাচ্ছে?—উত্তর পেতে হলে আমাদের যেতে হবে ২০০৪ সালে।
ভারতের রাজনীতিতে ২০০৪ সালে সোনিয়া গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী না হয়ে মনমোহন সিংকে সেই পদে বসিয়েছিলেন, তখন ‘এক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ বা ‘ঘটনাক্রমে প্রধানমন্ত্রী’ পরিভাষাটি জনপ্রিয়তা পায়। বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে আইনি ও কৌশলগত বিলম্ব এবং সালাহউদ্দিন আহমেদের ক্লিন ইমেজ—সব মিলিয়ে একই ধরণের একটি সমীকরণের আভাস পাচ্ছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু বর্তমানে তারেক রহমান। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের আকাঙ্ক্ষা, নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে তিনিই হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু বাস্তবতা হলো: তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় সাজা হয়েছিল। যদিও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক মামলা প্রত্যাহার বা স্থগিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে, তবুও আইনিভাবে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মহলের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিএনপি হয়তো এখনই তারেক রহমানকে সরাসরি সরকার প্রধানের পদে না-ও বসাতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দলের প্রয়োজন এমন একজন বিশ্বস্ত নেতা, যিনি সরকার পরিচালনা করবেন কিন্তু দলের মূল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু (তারেক রহমান) কে চ্যালেঞ্জ করবেন না।
দীর্ঘদিন ভারতে আইনি লড়াই ও নির্বাসনে থাকার পর সালাহউদ্দিন আহমেদের দেশে ফেরা এবং রাজকীয় সংবর্ধনা তাকে লাইমলাইটে নিয়ে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো:— কেন তাকে ‘এক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ বা মনমোহন সিংয়ের সাথে তুলনা করা হচ্ছে?
মনমোহন সিং যেমন একজন টেকনোক্র্যাট ও আমলা ছিলেন, সালাহউদ্দিন আহমেদও বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা। পরবর্তীতে তিনি রাজনীতিতে এসে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকার পরিচালনার প্রশাসনিক দক্ষতা তাঁর রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ ব্যক্তি হিসেবে মৃদুভাষী এবং ভদ্র হিসেবে পরিচিত। দলের ভেতরে তার কোনো নিজস্ব শক্তিশালী ‘বিদ্রোহী বলয়’ নেই, যা তাকে হাইকমান্ডের জন্য নিরাপদ পছন্দ (Safe Choice)হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ভারতের দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি দলের প্রতি বা জিয়া পরিবারের প্রতি কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেননি বা দল ভাঙার চেষ্টা করেননি। এই ‘পরীক্ষিত আনুগত্য’ তাকে তারেক রহমানের আস্থার পাত্র করে তুলেছে।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট আর বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকে পাশাপাশি রাখলে মনমোহন সিং এবং সালাহউদ্দিন আহমেদের মধ্যে বেশ কিছু কাঠামোগত মিল ও অমিল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ষমতার উৎসের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায়, ভারতে সোনিয়া গান্ধী যেমন দলীয় প্রধান হিসেবে মূল ক্ষমতার চাবিকাঠি বা ‘ডি-ফ্যাক্টো লিডার’ ছিলেন, বাংলাদেশেও তারেক রহমান ঠিক সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন। অর্থাৎ, সরকার প্রধানের চেয়ারে অন্য কেউ থাকলেও মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকবে দলীয় প্রধানের হাতেই।
ব্যক্তিগত ইমেজের ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য লক্ষণীয়। মনমোহন সিং ছিলেন মূলত একজন অর্থনীতিবিদ ও টেকনোক্র্যাট, যার প্রত্যক্ষ রাজনীতির অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত। অন্যদিকে, সালাহউদ্দিন আহমেদ বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনীতিবিদ। অর্থাৎ, তার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক—উভয় অভিজ্ঞতাই রয়েছে।
তবে দুজনের সামনে চ্যালেঞ্জের প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে। মনমোহন সিংকে যেখানে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও জোট রাজনীতির জটিল সমীকরণ সামলাতে হতো, সেখানে সালাহউদ্দিন আহমেদকে হয়তো বিপ্লব-পরবর্তী প্রশাসন ঢেলে সাজানো এবং ছাত্র-জনতার আকাশচুম্বী আকাঙ্ক্ষা পূরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
চূড়ান্ত বিচারে তাঁদের ভূমিকার ধরণটি অনেকটা একই রকম হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল—মনমোহন সিং যেমন সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো প্রশাসনিকভাবে বাস্তবায়ন করতেন, সালাহউদ্দিন আহমেদও হয়তো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের ‘এক্সিকিউটিভ ইমপ্লিমেন্টার’ বা বাস্তব রূপকার হিসেবে কাজ করবেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো একজন সজ্জন ও শিক্ষিত ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী করলে পশ্চিমা বিশ্ব ও ভারতের কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। তারেক রহমান
সরাসরি সরকার প্রধান না হলে সরকার পরিচালনায় কোনো ব্যর্থতা বা অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তের দায়ভার সরাসরি তারেক রহমানের ওপর পড়বে না। তিনি ‘কিংমেকার’ হিসেবে দলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন।
তবে The Accidental Prime Minister মুভিতে যেমন দেখানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এবং দলীয় প্রধানের বাসভবনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা অনেক বেশি, তাই একজন ‘প্রক্সি’ প্রধানমন্ত্রী কতটুকু স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
এছাড়া, বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা ‘জিয়া পরিবার’ থেকেই কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়। অন্য কাউকে এই পদে বসালে কর্মীদের মধ্যেও একটি মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
সবমিলিয়ে বলা যায়, সালাহউদ্দিন আহমেদ মনমোহন সিংয়ের মতো এক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার হবেন কি না?
আলোচনাটি এখনও পর্যন্ত ‘হাইপোথিসিস’ বা রাজনৈতিক গুঞ্জন। তবে রাজনীতির মাঠে গুঞ্জন অনেক সময় ভবিষ্যতের বার্তা বহন করে।
যদি নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জটিলতায় তারেক রহমান দেশে ফিরতে না পারেন, তবে বিএনপিকে বাধ্য হয়েই একজন ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ বা ‘বিশ্বস্ত’ প্রধানমন্ত্রী বেছে নিত হবে। সেক্ষেত্রে সালাহউদ্দিন আহমেদ তার জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা এবং আনুগত্যের কারণে তালিকার শীর্ষে থাকতে পারেন।
তবে তিনি মনমোহন সিংয়ের মতো পুরোপুরি ‘পুতুল’ হবেন, নাকি নিজের প্রশাসনিক দক্ষতায় স্বকীয়তা বজায় রাখবেন—তা সময়ই বলে দেবে। বাংলাদেশ হয়তো সরাসরি মুভির মতো চিত্রনাট্য দেখবে না, তবে ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি নতুন সমীকরণ দেখার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
সৈয়দ সাকিব
![]()

