26 C
আবহাওয়া
৬:২৩ অপরাহ্ণ - অক্টোবর ৩১, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » ৫ই আগস্টের ভিডিও ও ‘র’ এজেন্ট তকমা! কী বলেছিলেন তাহসিফ?

৫ই আগস্টের ভিডিও ও ‘র’ এজেন্ট তকমা! কী বলেছিলেন তাহসিফ?


বিএনএ ডেস্ক: ২০১৮ সাল। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে জেনারেল ডিউটি (জিডি) পাইলট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এক তরুণ। লক্ষ্য ছিল—ঈগলের মতো ডানা মেলে মুক্ত আকাশে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। কিন্তু কে জানত, সেই রূপকথার মতো শুরু হওয়া গল্পের সমাপ্তিটা হবে ঢাকার তুরাগ নদের কুয়াশাচ্ছন্ন পানিতে, ভেসে থাকা এক নিষ্প্রাণ মরদেহ হয়ে?

বাঙালি সংস্কৃতিতে বানোয়াট কিংবা অবিশ্বাস্য কোনো কাহিনীকে আমরা যুগ যুগ ধরে বলে এসেছি ‘আষাঢ়ের গল্প’। যে ঈগল হয়ে আকাশে ভেসে থাকার কথা—সেই ঈগল শান্ত তুরাগ নদে ডুবে মরবে? এটি যেন অবাস্তবতার সব সীমা পার করে খোদ আষাঢ়ের গল্পকেও হার মানিয়েছে! ঢাকার তুরাগ নদের পাড়ে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি’র মৃত্যুকে ঘিরে যে বয়ান তৈরি করা হচ্ছে, তা হয়তো রূপকথার কাল্পনিক গল্পকেও লজ্জায় ফেলে দেবে।

সাবেক বিমানবাহিনীর পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তাঁর জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দ্বীপের দেওয়া প্রাথমিক জবানবন্দিকে সাধারণ মানুষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জজ মিয়া নাটক ২’ বা নতুন সংস্করণ বলে অভিহিত করছে।

বিমানবাহিনীর পাইলট ও কর্মকর্তাদের অত্যন্ত কঠোর শারীরিক ও মানসিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে “ওয়াটার সারভাইভাল ট্রেনিং” বা পানিতে বেঁচে থাকার বিশেষ কৌশলও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে সাধারণ পরিস্থিতিতে পানিতে পড়ে যাওয়া মাত্রই তাঁর মতো একজন মানুষের ডুবে যাওয়াটা বেশ অস্বাভাবিক।

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি থাকার কথা। কোনো দুর্ঘটনা বা ধাওয়ার শিকার হলেও তিনি যেভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার কথা, সুরতহাল ও দ্বীপের জবানবন্দির বিবরণ তার সাথে পুরোপুরি মিলছে না।

সুরতহাল প্রতিবেদনে তাঁর শরীরে কোনো দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি, তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা গেছে। যদি তিনি কেবলই সাঁতার না জেনে ডুবে যেতেন, তবে পেটে অতিরিক্ত পানি থাকা ছাড়া নাক দিয়ে রক্ত আসার বিষয়টি রহস্যের সৃষ্টি করে।

২৮ বছর বয়সী তাহসিফের গ্রামের বাড়ি খুলনার সোনাডাঙ্গায় হলেও তিনি সপরিবারে থাকতেন উত্তরার রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্টে। তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল ছেলের আত্মহত্যা বা পানিতে ডুবে মরার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে একে একটি “সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড” বলে দাবি করেছেন। কারণ, নিখোঁজ হওয়ার রাতে, অর্থাৎ ২৭শে অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তাঁর মায়ের ফোনে শেষ মেসেজ পাঠিয়েছিলেন—”আম্মু, আমি আসছি”। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।

তাহসিফ সাউরির জীবনের মোড় পুরোপুরি ঘুরে যায় ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঐতিহাসিক ও গোপন ভিডিওচিত্র ধারণ এবং সেটি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে তাহসিফ ছিলেন বলে দেশজুড়ে ব্যাপক গুঞ্জন তৈরি হয়। এরপরই তাঁর জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের কালো ছায়া।

গত বছরের ৪ঠা আগস্ট দৈনিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকা  বিমানবাহিনীর কিছু কর্মকর্তার ছবিসহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে তাহসিফকে সরাসরি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর এজেন্ট হিসেবে দাবি করা হয়। “বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরের ’র’ নেটওয়ার্ক ফাঁস” শিরোনামে  এই  প্রকাশিত  প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলেন সৈয়দ আবদাল আহমেদ।

অভিযোগ আছে, প্রতিবেদনটি উদ্দেশ্য মূলকভাবে দেশের আকাশ রক্ষার শপথ নেওয়া একজন সামরিক পাইলটের গায়ে রাতারাতি সেঁটে দেওয়া হয় ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘বিদেশী চর’-এর তকমা। যদিও আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (ISPR) পরবর্তীতে এক বিজ্ঞপ্তিতে এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অপপ্রচার বলে খণ্ডন করে এবং জানায় যে তাহসিফকে বিমানবাহিনীর নিজস্ব বিধিমালা অনুযায়ীই বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে গেছে।

মৃত্যুর মাত্র ৩ মাস আগে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ‘Speak With Rashid’ পডকাস্টে হাজির হয়ে এই বিষয়ে নিজের ক্ষোভ ও সত্য উগরে দিয়েছিলেন তাহসিফ সাউরি। ‘র’ এজেন্ট হওয়ার অভিযোগের জবাবে পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন—”আমার বিরুদ্ধে ‘র’-এর এজেন্ট হওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও হাস্যাস্পদ।

৫ই আগস্টের ভিডিও ফাঁসের ঘটনা নিয়ে তাহসিফ সাউরি সেই পডকাস্টে প্রকৃত সত্য ফাঁস করে বলেন—শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিওটি তিনি নিজে ধারণ করেনি। ভিডিওটি মূলত রিফাত আশরাফী নামের একজন কর্মকর্তা ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। কিন্তু বিমানবাহিনীর আভ্যন্তরীণ কিছু ভুল বোঝাবুঝি এবং তদন্তের মারপ্যাঁচে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তার নামটির সাথে এই ঘটনা জুড়ে দিয়ে তাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়। তিনি আরও বলেন ‘‘আমি যদি ভিডিওটি লিক করেই থাকি, তবে ডিজিটাল ফরেনসিকে তার কোনো প্রমাণ তারা কেন দেখাতে পারল না?  তাকে বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে ডেকে নিয়ে কী বলে ছিলেন তাও প্রকাশ করেন ওই পডকাস্টে।

চাকরি হারানোর পর তাহসিফকে এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি করা হয়। বিমানবাহিনীর আভ্যন্তরীণ তদন্তের অজুহাতে প্রায় দুই বছর তাঁর পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে তাঁর পেশাদারিত্বের ওপর। সিভিল এভিয়েশনে পাইলট হিসেবে নতুন ক্যারিয়ার গড়ার জন্য তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ‘ফ্লাইং আওয়ার্স’ অফিশিয়াল লগবুক ক্লিয়ারেন্স আটকে দেয় কর্তৃপক্ষ। যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাননি।

তাহসিফ সাউরি নামের এই ঈগলের ডানা সচল থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক এই বাধার কারণে তিনি কোনো কমার্শিয়াল লাইসেন্স পাচ্ছিলেন না, যোগ দিতে পারছিলেন না কোনো বিমান সংস্থায়। আকাশে ওড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে তরুণ এই পাইলট প্রতিমুহূর্তে মানসিক ট্রমা এবং এক অজানা নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্কে ভুগছিলেন—যা তাঁর বাবার বক্তব্যেও উঠে এসেছে।

বিমানবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর, পাসপোর্ট ও ফ্লাইং আওয়ার্স আটকে রেখে ক্যারিয়ার ধ্বংসের চেষ্টা, গণমাধ্যমে ‘র’ এজেন্ট বানানোর অপপ্রচার, আর ৫ই আগস্টের সেই স্পর্শকাতর ভিডিওর নেপথ্য রাজনীতি—সব সুতো কি তবে এক বিন্দুতেই মিলেছে?

দেশের আকাশ কাঁপানো যে ঈগলের ডানা মেলার কথা ছিল নীল দিগন্তে, সে আজ চিরতরে শান্ত হয়ে তলিয়ে গেছে তুরাগের অতলে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হয়তো একদিন আলোর মুখ দেখবে। কিন্তু তত দিন পর্যন্ত প্রতিটি বিবেকবান মানুষের মনে এই প্রশ্নটি প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে—তাহসিফ সাউরির এই রহস্যময় বিদায় কি আসলেই এক নির্মম নিয়তি, নাকি সত্যকে আড়াল করার জন্য বুনে দেওয়া আষাঢ়ের গল্পকেও হার মানানো এক সুনিপুণ নাটক?

 

বিএনএ /  শাম্মী

Loading


শিরোনাম বিএনএ