33 C
আবহাওয়া
৫:২৪ অপরাহ্ণ - আগস্ট ২৯, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » নোয়াখালীতে পুত্রবধূকে নিয়ে শ্বশুর উধাও! ইসলাম কী বলে?

নোয়াখালীতে পুত্রবধূকে নিয়ে শ্বশুর উধাও! ইসলাম কী বলে?


বিএনএ, ডেস্ক : ছেলের মৃত্যুর পর যে শ্বশুর হওয়ার কথা ছিল বাবার মতো আশ্রয়, সেই শ্বশুরই কি না নিজের পুত্রবধূকে নিয়ে উধাও!  নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ঘটে যাওয়া এক লোমহর্ষক ও লজ্জাজনক ঘটনা এখন পুরো দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কিন্তু শুধু সমাজ নয়, পবিত্র কুরআন ও হাদীস এই জঘন্যতম কাজটির ব্যাপারে কতটা কঠোর? ছেলে মারা গেলেও কি পুত্রবধূ শ্বশুরের জন্য আজীবন হারাম?

গত ১৬ই আগস্ট নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরক্লার্ক ইউনিয়নে চরমজিদ গ্রামে এই অবিশ্বাস্য – চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে।  স্থানীয়দের দাবি, হেলাল নামের এক ব্যক্তি তাঁর নিজের মৃত ছেলের বউ রাবেয়াকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। ছেলের মৃত্যুর পর থেকেই নাকি তাদের ঘিরে পরিবারে নানা গুঞ্জন ছিল। স্বজনদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তি তথাকথিত ‘কালো জাদু’ বা কোনো বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে পুত্রবধূকে নিয়ে গেছেন। ঘটনার পর থেকেই শ্বশুরের মোবাইল ফোন বন্ধ এবং তারা দুজনেই নিখোঁজ। এই ঘটনা সমাজকে স্তব্ধ করেছে।

কেইস স্টাডি-১:  ২০১৯ সালের ১৮ই আগস্ট রাতে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নে এক পাষণ্ড শ্বশুর তাঁর নিজের পুত্রবধূকে ঘরে একা পেয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করার সময় গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়ে এবং পরের দিন ১৯শে আগস্ট পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

কেইস স্টাডি-০২ : ২০১৯ সালের ২৪শে আগস্ট পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার তোড়েয়া ইউনিয়নে নুর ইসলাম নামের ৪৫ বছর বয়সী এক শ্বশুর তাঁর নিজের ছেলের বউকে নিয়ে পালিয়ে যান এবং পরবর্তীতে ঢাকায় গিয়ে সংসার শুরু করেন।

কেইস স্টাডি-০৩ : ২০২৩ সালের ২৪শে জানুয়ারি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নে ৫৪ বছর বয়সী এক শ্বশুর তাঁর ১৮ বছর বয়সী পুত্রবধূকে নিয়ে পালিয়ে যান।

 

কেইস স্টাডি-০৪ : ২০২৩ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার ঝাউগড়া গ্রামেও ৫০ বছর বয়সী এক শ্বশুর তাঁর নিজের ছেলের বউকে নিয়ে উধাও হয়ে যান।

 

এসব নিকৃষ্ট অপরাধের ব্যাপারে আমাদের পবিত্র ধর্ম ইসলাম কী ফয়সালা দেয়।

ইসলামে পারিবারিক সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষায় অত্যন্ত স্পষ্ট আইন রয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে কোন্ নারীকে বিয়ে করা যাবে, কোন নারীকে বিয়ে করা যাবে না সেইসব নারীদের তালিকা দিয়েছেন। সেখানে আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন— ‘তোমাদের ঔরসজাত ছেলেদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য হারাম ।’

ইসলামী শরীয়তের ফিকহ পরিভাষায় একে বলা হয় ‘হুরমাতে মুসাহারা’ বা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে সৃষ্ট চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা। ছেলে বেঁচে থাকুক, তাকে তালাক দিক, কিংবা ছেলে মারা যাক—যেকোনো অবস্থাতেই নিজের আপন ছেলের বউকে বিয়ে করা বা তাঁর সাথে কোনো অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা শ্বশুরের জন্য চিরতরে হারাম এবং জঘন্যতম কবিরা গুনাহ।

অনেকেই মনে করেন, ছেলে মারা গেছে তো পুত্রবধূর সাথে পর্দা কিসের? কিংবা শ্বশুর তো বাবার মতোই, তাই অবাধ মেলামেশায় সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে এই পারিবারিক ফেতনার ব্যাপারে আমাদের কঠিন সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন!

সহীহ বুখারী ও মুসলিম হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন নারীদের নির্জন কক্ষে প্রবেশ করতে নিষেধ করলেন, তখন এক আনসারী সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন—’হে আল্লাহর রাসূল! স্বামীর আত্মীয়দের (যেমন দেবর বা শ্বশুরকূলের) ব্যাপারে আপনার মতামত কী?’ আল্লাহর রাসূল (সা.) একটিমাত্র বাক্যে উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন—’তারা তো মৃত্যু সমতুল্য!’

কেন তিনি ‘মৃত্যু সমতুল্য’ বললেন? কারণ, পরিবারের ভেতরের মানুষকে কেউ সহজে সন্দেহ করে না। আর এই সুযোগেই শয়তান মানুষের মনে বাসা বাঁধে। যার চূড়ান্ত পরিণতি নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এই ঘটনার মতো সমাজ বিধ্বংসী ও লজ্জাজনক বিপর্যয়!

 

যেহেতু শ্বশুর একজন বিবাহিত পুরুষ তাই ইসলামী শরীয়া অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রকাশ্য আদালতে তাঁকে ‘রজম’ বা পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

 

অন্যদিকে স্বামী মারা যাওয়ার পর ইদ্দত বা  শোক পালনের নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়ে গেলে পুত্রবধূ ইসলামী আইনে ‘অবিবাহিত বা কুমারী’ নারীর মর্যাদায় ফিরে যান। এই অবস্থায় তিনি যদি নিজের ইচ্ছায় বা সম্মতিতে এই জঘন্য পাপে লিপ্ত হন, তবে শরীয়া আইন অনুযায়ী তাঁর শাস্তি ১০০ দোররা বা চাবুক মারা এবং এক বছরের জন্য এলাকা বা দেশ থেকে নির্বাসন।

তবে বাংলাদেশে শরীয়া আইন কার্যকর নয়-বাংলাদেশের আইন মূলত ১৮৬০ সালের প্যানাল কোড এর  ব্রিটিশ দণ্ডবিধি  দ্বারা পরিচালিত। পুত্রবধূ যদি স্বেচ্ছায় না গিয়ে থাকেন, বরং শ্বশুর যদি তাকে জাদুটোনা, ভয়ভীতি, ব্ল্যাকমেইল বা জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করে থাকেন—তবে তা সরাসরি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী এই লম্পট শ্বশুরের শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদন্ড, তবে পুত্রবধূর কোনো শাস্তি হবে না। কারণ এই আইনে তিনি কোনো অপরাধী নন, বরং একজন ‘ভুক্তভোগী’ বা ‘নির্যাতনের শিকার’ নারী।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এই শ্বশুর-পুত্রবধূ বিয়ে করেছেন কি না তা এখনও জানা না গেলেও, ধর্ম ও আইন কোনোটিই এই সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেয় না। এটি কেবলই একটি সামাজিক অপরাধ ও ব্যভিচার।

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, রক্তের সম্পর্ক ও বৈবাহিক সূত্রের নিষিদ্ধ তালিকায়  শ্বশুর-পুত্রবধূর অবস্থান থাকায় দেশের আদালতেও এই বিয়ের কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই

ইসলামের আইন অনুযায়ী, ছেলে মারা যাওয়ার পর পুত্রবধূর অবস্থান নিজের মেয়ের মতোই থাকে। শ্বশুর হবেন তাঁর অভিভাবক, তাঁর সন্তানদের দাদা ও আশ্রয়দাতা। কিন্তু সেই পবিত্র সম্পর্ককে কলঙ্কিত করে যারা সমাজ ও ধর্মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে, তারা মূলত ইহকাল এবং পরকাল—দুই জায়গাতেই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে। জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের সেই কুপ্রথাকে ইসলাম গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, আজ আমাদের সমাজ যেন আবার সেই অন্ধকারেই তলিয়ে যাচ্ছে। এই ধরণের সামাজিক অবক্ষয় রুখতে ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

 

 

শামীমা চৌধুরী শাম্মী

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ