29 C
আবহাওয়া
৩:৪৮ অপরাহ্ণ - সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » সার্জিও গোরের স্পট ভিজিট: রোহিঙ্গা সংকটের আড়ালে মিয়ানমার করিডোর?

সার্জিও গোরের স্পট ভিজিট: রোহিঙ্গা সংকটের আড়ালে মিয়ানমার করিডোর?


বিএনএ, ডেস্ক :ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ‘রাখাইন করিডোর’ চেয়েছিল— যা সেনাপ্রধান ও বিএনপির বিরোধিতায় চাপা পড়ে গিয়েছিল— সেই করিডোর কি এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক চীন সফর এবং বেইজিংয়ের সাথে ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ গড়ার কাজ শুরু করার পরেই কেন হঠাৎ ঢাকা সফরে আসছেন ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বিশেষ দূত সার্জিও গোর? ৩০শে জুলাই ঢাকায় পা রেখেই তিনি কেন সরাসরি ছুটে যাচ্ছেন কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে? একদিকে বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব, অন্যদিকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং ট্রাম্পের দূতের এই গোপন মিশন— কী ঘটছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিতে?

ঘটনার সূত্রপাত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ মূলত মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তার অজুহাতে একটি ‘রাখাইন করিডোর’ বা মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর স্থাপনের জন্য ড. ইউনূস সরকারের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল মূলত বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে চীনের প্রভাব রুখতে আমেরিকার এক সুদূরপ্রসারী চাল। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং বিএনপি এই একপাক্ষিক করিডোরের তীব্র বিরোধিতা করেন। সেনাপ্রধান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন— জাতীয় ঐক্যমত্য ছাড়া এমন কোনো করিডোর দেওয়া যাবে না, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিতে ফেলে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই পরিকল্পনা সাময়িকভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়।

কিন্তু খেলা ঘুরে যায় বিএনপি সরকার গঠনের পর। দায়িত্ব নেওয়ার পরেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিং সফর করেন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন। সেখানে কেবল অর্থনৈতিক করিডোর নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীনের সাথে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক ও ডিফেন্স বা প্রতিরক্ষা সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হয়। বেইজিং স্পষ্ট বার্তা দেয়— যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক চাপে বাংলাদেশের পাশে থাকবে চীন। এর পরপরই চীনের রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন যে, ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ এর কাজ অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বেইজিং এখন ঢাকার ওপর নিজেদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত করছে।

চীনের এই বিশাল পদক্ষেপে স্বভাবতই ঘুম উড়েছে ওয়াশিংটন এবং দিল্লির। আর ঠিক এই সময়েই, ৩০শে জুলাই তিন দিনের বিশেষ সফরে ঢাকা আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। কূটনীতিকরা বলছেন, গোরের এই সফরের প্রধান লক্ষ্যই হলো বাংলাদেশ যে চীনের দিকে হেলে পড়ছে, তা খতিয়ে দেখা।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে বৈঠক শেষেই সার্জিও গোর সরাসরি চলে যাচ্ছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে! কেন এই রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর?

বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইনে জান্তা বাহিনীকে হটিয়ে এখন “আরাকান আর্মি” পুরো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। আমেরিকা রোহিঙ্গা সংকট এবং মানবিক করিডোরের ইস্যুটিকে সামনে রেখে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ বাড়াতে চায়, যাতে চীনের কুনমিং-রাখাইন করিডোরকে কাউন্টার করা যায়। সার্জিও গোরের এই স্পট ভিজিট আসলে মার্কিন ‘রাখাইন করিডোর’ পরিকল্পনারই প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ।

এই পুরো সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিয়ানমার। সেখানে জান্তা সরকারকে হটিয়ে আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্তের রাখাইন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট আরও জটিল রূপ নিয়েছে। আমেরিকা চাচ্ছে আরাকান আর্মিকে ব্যবহার করে এই করিডোরের মাধ্যমে রাখাইনে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে, অন্যদিকে চীন অলরেডি মিয়ানমারের জান্তা ও বিদ্রোহী— উভয় পক্ষের সাথেই সম্পর্ক বজায় রেখে তাদের করিডোর নিরাপদ করছে। মাঝখান থেকে ভারত দেখছে বড় বিপদের মেঘ। বাংলাদেশের নতুন সরকার বেইজিংয়ের সাথে প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো চুক্তি করায় ভারতের নিরাপত্তা বলয় বড় ধাক্কা খেয়েছে। তাই সার্জিও গোর একই সাথে দিল্লির উদ্বেগকেও ঢাকার টেবিল টপ বৈঠকে তুলে ধরবেন।

এর মাঝেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি চরম উত্তপ্ত। ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার বার্তা, চলমান রাজনীতিকে আরও রহস্যময় করে তুলছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ঢাকা যদি মার্কিন করিডোরের প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে চীনের সাথে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ে, তবে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়াতে ‘শেখ হাসিনা কার্ড’ বা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার মতো পরোক্ষ কৌশল ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ, সার্জিও গোরের এই সফর কেবল একটি কূটনৈতিক সফর নয়, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকও নির্ধারণ করতে পারে।

গবেষণা ও গ্রন্থনা–ইয়াসীন হীরা 

Loading


শিরোনাম বিএনএ