বিএনএ, ঢাকা : কথায় বলে রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের ২০২১ সালের এই বক্তব্যই তার প্রমাণ। এক সময়কার শত্রু জামায়াতে ইসলামী এখন পরম বন্ধু।
প্রসঙ্গত, জামায়াতে ইসলামী ১৯৪১ সালে মাওলানা মওদুদী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি আধুনিক রাজনৈতিক ইসলামি সংগঠন। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন ১৯৮৭ সালে পীর সাহেব চরমোনাই দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, যা মূলত সুফিবাদ ও কওমি ধারায় প্রভাবিত। অতীতে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম জামায়াতে ইসলামীকে “ইসলামের শত্রু” এবং “প্রতারক” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন ।
তিনি দাবি করেছিলেন, জামায়াত ইসলামী কুরআন ও কোনো সুন্নাহ-ভিত্তিক দল নয়।
কিন্তু পরস্পর বিরোধী ইসলাম ভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন, বাঘে- মহিষে এক ঘাটে পানি পান করার মতো ঘটনা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দুই দল বিএনপি’র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রচারাভিযানে নেমেছে। স্বপ্ন দেখছেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার। সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে জেনে নেই, কখন থেকে জামায়াত ইসলামীর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের পথচলা শুরু হয়?
২০২৩ সালের ১২ই জুন। সকাল থেকে বরিশাল সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। পড়ন্ত বিকালে মেয়র পদে ইসলামী আন্দোলন মনোনীত প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম পৌর এলাকার সাবেরা খাতুন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি জাল ভোট ও তার এজেন্টকে বের করে দেয়ার অভিযোগ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমকে মারধর করেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত এর লোকজন। এই অবস্থায় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন ফয়জুল করীম।
এই ঘটনার পরদিন ১৩ জুন বরিশালে ফয়জুল করীমকে দেখতে যান জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানীর নেতৃত্বে জামায়াত ইসলামীর ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। তখন থেকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে চরমোনাই পীরের সর্ম্পকের কঠিন বরফ গলতে শুরু করে।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পরবর্তীতে এই সর্ম্পক আরও গাঢ় হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২১শে জানুয়ারি বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই মাদ্রাসায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তারা বলেন, জনগণ প্রত্যাশা করছে আগামী নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্রে যেন ‘একটি বাক্স’ থাকে। তখন থেকে দল দুটি তাদের দীর্ঘদিনের দূরত্ব ঘুচিয়ে নতুন এক ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেন। উভয় দলই গণঅআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যূত হওয়া আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপির সমালোচনায় মূখর হন। একে অপরের হাত ধরাধরি করে রাজনৈতিক প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আসছেন। আরও ৬টি দল নিয়ে গঠন করেন ৮ দলীয় জোট। যা বিএনপির বিপক্ষে আলাদা শক্তিশালী জোট হিসেবেই মাঠে কাজ করছে।
কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ও চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নিয়ে সেই ‘এক বাক্স’ তত্ত্ব এক বছরের মধ্যে ‘অসার’ প্রমাণিত হতে চলেছে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে একক প্রার্থী দিতে কাজ করলেও আট দল নিজেদের জোট বলছে না। তারা একে আসন সমঝোতা বলছে। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ১৫০ আসনের তালিকা দিয়েছে। দলটি অতীতে কখনও সংসদে যেতে পারেনি। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোট পেয়েছিল শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক শতাংশেরও কম।
এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৫০, খেলাফত মজলিস ৩০, খেলাফত আন্দোলন ২৫ আসনের তালিকা দিয়েছে। তালিকা দিয়েছে জাগপা এবং বিডিপি। সবমিলিয়ে শরিকরা ২৭০ আসন চাইছে জামায়াতের কাছে। ফলে শরিকদের সঙ্গে সহজেই আসন সমঝোতা জটিল আকার ধারণ করেছে।
চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ১৫০ আসনের তালিকা দিলেও অন্তত ১২০ আসন ছাড় চাইছে। চরমোনাইর পীর নিজেরা ১২০ আসনে এবং জামায়াতকে ১৩০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। বাকি ৫০ আসন অন্যান্য দলকে ছাড়তে চান। এতে জামায়াতে ইসলামী রাজি হয়নি। গত অক্টোবরে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছিলেন, শরিকদের ১০০ আসন ছাড়া হবে। তবে এখন ওই বক্তব্যকে অনানুষ্ঠানিক বলছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্য যখন আসন নিয়ে দরকষাকষি চলছে তখন কাবাবের মধ্যে হাড্ডি হয়ে দেখা দিয়েছে কিংস পার্টি খ্যাত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
বিএনপি’র সঙ্গে জোট সঙ্গী হতে দলটি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। এই অবস্থায় এনসিপি জামায়াত ইসলামীর ওপর ভর করেছে। জামায়াতে ইসলামী এনসিপিকে ৩০টি আসন দিয়ে নিজেদের পাল্লা ভারি করতে চায়। এতে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল তা এখন একপাশ ঝুলে গেছে। অর্থাৎ কমে যাবে হাত পাখার আসন সংখ্যা। এতে দুই দলের দীর্ঘদিনের সখ্যতা ও নির্বাচনী জোটে এক ধরনের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়পত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৯ ডিসেম্বর। কোন দল কোন আসনে প্রার্থী দেবে– এ মতবিরোধে আটকে গেছে নির্বাচনী সমঝোতা। আসন সমঝোতা না হওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে ৮ দলের অন্য শরিক দল গুলো।
জামায়াত ইসলামীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শরিকরা এমন সব আসন দাবি করছে, যেখানে তাদের অবস্থান জামায়াতের তুলনায় খুবই দুর্বল। তাদের ওইসব আসন ছাড়লে পরাজয় নিশ্চিত। কয়েকটি আসনে শরিক দলের প্রার্থী হতে চান বিএনপি থেকে আসা নেতারা। তাদের নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু দুটি আসনে জাতীয় পার্টি থেকে আসা আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা রয়েছেন। তাদের জোটের প্রার্থী করা জামায়াতের জন্য অস্বস্তিকর।
৫০ আসন চাওয়া খেলাফত মজলিস প্রতি জেলায় একজন করে প্রার্থী দিতে চায়। দলটি ২৫ আসনের কমে মানতে নারাজ। ২০১৮ সালে হবিগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি জোটের ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী দলটির মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদের। এবার তিনি জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় রয়েছেন। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ঢাকা থেকে নির্বাচনে আগ্রহী ছিলেন।
হবিগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী পরিবর্তন করে সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমানকে দাঁড়িপাল্লা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর আবদুল কাদেরও হবিগঞ্জ-৪ থেকেই নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নির্বাচনের আগ্রহ জানিয়েছেন।
ডামি নির্বাচনখ্যাত ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল খেলাফত আন্দোলন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দলটির নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সরিয়ে দিয়ে দলটি জামায়াতের সঙ্গে এসেছে। জামায়াত নেতারা বলেছেন, এমন কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না, যারা আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।
৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন জাতীয় পার্টির কয়েকজন সাবেক নেতা। তাদের একজন কারি মো. হাবিবুল্লাহ বেলালী। তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। ছিলেন শেখ হাসিনা আমলের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের অনুসারী। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর জি এম কাদেরের সঙ্গে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধে জাতীয় পার্টি ভাঙলে রওশনের সঙ্গে যোগ দেন বেলালী। ওই বছরের এপ্রিলে রওশনের নেতৃত্বাধীন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য হন তিনি।
তবে ৫ আগস্টের পর ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন বেলালী। তাঁকে ময়মনসিংহ-১০ আসনে প্রার্থী করতে চান চরমোনাই পীর। অতীত ভূমিকার কারণে তাঁকে নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জামায়াতের নেতারা।
দশম সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশনের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন গোলাম মসিহ। ২০১৫ সাল থেকে পাঁচ বছর তিনি সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক এই জাপা নেতা ৫ আগস্টের পর ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তাঁকে নারায়ণগঞ্জ থেকে আট দলের প্রার্থী করতে চান চরমোনাই পীর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিরোধী জোট শক্তিশালী করতেই জামায়াতে ইসলামী এনসিপিকে জোটে নিতে চায়। কারণ এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেহেতু অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না সেহেতু বিএনপির বিরুদ্ধে বাকি সব শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলে কোনো নতুন দল বা নতুন জোট ক্ষমতায় আসবে এমনটা মনে করেন অনেকেই। যদিও এই সময়ের বাংলাদেশে এটি কতটা সম্ভব—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এনসিপিকে জামায়াতে ইসলামী গুরুত্ব দিয়ে জোটে নিলে এবং ইসলামী আন্দোলনের আসন সংখ্যা কমে গেলে দলটি জোট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের ২০২১ সালে জামায়াত ইসলামীকে নিয়ে করা মন্তব্য সত্য হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনএনিউজ/শামীমা চৌধুরী শাম্মী/এইচ.এম।
![]()

