বিএনএ, ঢাকা : পটুয়াখালী। বাংলাদেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে বরিশাল বিভাগের একটি অন্যতম উপকূলীয় জেলা, যা ‘সাগরকন্যা’ কুয়াকাটার জন্য সুপরিচিত। এখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত উভয়ই দেখা যায়। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জেলা লাউকাঠি নদীর তীরে অবস্থিত এবং এর উত্তরে বরিশাল, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভোলা ও পশ্চিমে বরগুনা জেলা অবস্থিত।
পটুয়াখালী জেলার ৪টি আসনের মধ্যে বাউফল উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী-২ সংসদীয় আসনটি অন্যতম। এটি জাতীয় সংসদের ১১২ তম আসন। আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে পটুয়াখালী- ২ (বাউফল) আসনে বিভিন্ন দলের ৫জন নির্বাচনী মাঠে থাকলেও মূল লড়াই হবে বিএনপির সহিদুল আলম তালুকদার এবং জামায়াতে ইসলামীর ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের মধ্যে। কেমন হবে এই দুই জনের ভোটের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে নি- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনায়।
১৯৯১ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১২ হাজার ২ শত ১৬ জন। ভোট প্রদান করেন ৮৮ হাজার ৫ শত ১৬ জন। নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের আ.স ম ফিরোজ। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪০ হাজার ২শত শত ২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু জাফর খান খান। তিনি পান ২০ হাজার ২শত ২১ ভোট।
১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৪ শত ২৮ জন। ভোট প্রদান করেন ৯৮ হাজার ৯ শত ৭ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আ.স ম ফিরোজ বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪৫ হাজার ৯ শত ৩৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির শহীদুল আলম তালুকদার। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান হাজার ৪৫ হাজার ৯ শত ১৩ ভোট।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ২৬ হাজার ৭শত ৬৬ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫ শত ৪১ জন। নির্বাচনে বিএনপির শহীদুল আলম বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৬৯ হাজার ৭ শত ৩৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের আ.স ম ফিরোজ। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৫২ হাজার ৮ শত ৪ ভোট।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১৬ হাজার ৯ শত ৬৯ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ১ শত ৮১ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আ.স. ম ফিরোজ বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৯৭ হাজার ৮ শত ৭৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আহমেদ তালুকদার । ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৫৭ হাজার ৫ শত ৩৭ ভোট।
এবার আসা যাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছিল সেই বিশ্লেষণে।
নির্বাচন কমিশনে থেকে প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৩৬.৭৩% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪০.৩৪ %, বিএনপি ৪৫.৯৭%, জাতীয় পার্টি ২.২১% , জামায়াত ইসলামী ২.১৪% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৯.৩৪% ভোট পায়।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬২.০০%। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৭.৩৩%, বিএনপি ৩৮.৭৬%, জাতীয় পাটি ৩.৯৫% জামায়াত ইসলামী ১.৫১ %, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৮.৪৫% ভোট পায়।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬১.২৬% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪১.৪১%, ৪দলীয় জোট ৪৯.৩৬%, জাতীয় পার্টি ৮.৯৫%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.২৮% ভোট পায়।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮৩.৬৯% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ৫৭.৯৪%, ৪দলীয় জোট ৩৫.২১%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৬.৮৫% ভোট পায়।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পটুয়াখালী-২ আসনে পঞ্চম, সপ্তম, নবম সংসদে আওয়ামী লীগ, অষ্টম সংসদে বিএনপি বিজয়ী হয়।
এবার আসা যাক, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পটুয়াখালী-২ আসনে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? কারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন?
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আ.স.ম ফিরোজ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বিজয়ী হন।
২০১৮ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৫১ হাজার ৮ শত ৭৩ জন। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৪ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের আ.স ম ফিরোজ, সাবেক সাংসদ মো. শহিদুল আলম তালুকদারের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করার পরিপ্রেক্ষিতে তার স্ত্রী ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির সালমা আলম বিএনপির প্রার্থী হন। এছাড়া কাস্তে প্রতীকে সিপিবির শাহবুদ্দিন আহমেদ, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের নজরুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।
কিন্তু নির্বাচনের আগের দিন প্রশাসনের যোগসাজসে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন রাতে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ৩০-৪০ শতাংশ ব্যালট নিজেদের কবজায় নিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মারে রাখে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আ.স.ম ফিরোজ বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে।
২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত ইসলামীসহ তাদের সমমনা দল গুলো নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আ.স ম ফিরোজকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে জোটের প্রার্থী সহিদুল আলম তালুকদার, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১০ দলীয় জোটের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াত ইসলামীর সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের মালেক হোসেন, ঈগল প্রতীকে আমার বাংলাদেশ পার্টির প্রার্থী মো. রুহুল আমিন এবং ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের মো. হাবিবুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বতা করছেন। তবে বিএনপি প্রার্থী সহিদুল আলম তালুকদার ও জামায়াতে ইসলামীর ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় ভোটাররা। তবে জয়-পরাজয়ে আওয়ামী লীগের ভোটারা ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দিয়েছে।
নির্বাচনী লড়াইয়ের আগে বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার আরেক লড়াই শুরু হয়ে গেছে। গত ১৪ই জানুয়ারি বাউফলের চরমিয়াজান বাজারে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বত্তরা। একইভাবে গত ২৩ শে জানুয়ারি আওয়ামী লীগের এক নেতা বিএনপিতে যোগ দেয়ার ঘটনার জের ধরে ২টি বাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। যা নিয়ে পুরো বাউফলে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাউফল ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একটি শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না দেশের প্রবীন এই দলটি। আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের ভোটার এই নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন দিতে পারে—এমন একটি সম্ভাবনাও জাতীয়ভাবে উঠে এসেছে, যার সুফল বিএনপি পেতে পারে। এছাড়া বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সহিদুল আলম তালুকদার দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তিনি ২০০১ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। ওই সময় জামায়াত ইসলামী বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বিএনপির একাংশ নিজস্ব প্রার্থীর মনোনয়নের বিরুদ্ধে মশাল মিছিল করে অভ্যন্তরীণ কোন্দলেরও ইঙ্গিত দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোটে না থাকলেও জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বির মূখোমুখি হতে হচ্ছে বিএনপির প্রার্থীকে। জামায়াতে ইসলামীর আছে বিশাল ভোট ব্যাংক; এছাড়াও দলটির প্রার্থী ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের রয়েছে ক্লিন ইমেজ ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। তার বাবা একজন কলেজ শিক্ষক; স্ত্রী একজন একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনকারি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মেধা-যোগ্যতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।
গত ২০ মাস ধরে ব্যাপক গণসংযোগ ও পথসভার মাধ্যমে ভোটারদের মধ্যে নিজের অবস্থান বেশ মজবুত করেছেন। ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক এই কেন্দ্রীয় সভাপতির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং জামায়াতের সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক প্রস্তুতির কারণে জয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী তিনি।
বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর এর দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত দেখা যায়, এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে লড়াই হবে সমানে সমান। বিশেষ করে তরুন ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন ভোটারদের মধ্যে জামায়াত প্রার্থীর প্রতি একটি বাড়তি ঝোঁক পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ কোনো অঘটন ঘটালে— অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
বিএনএনিউজ/ সৈয়দ সাকিব/ এইচ.এম।
![]()


