Bnanews24.com
সম্পাদকীয়

বাঙালির চেতনার প্রতীক মহান একুশ

বাঙালির চেতনার প্রতীক মহান একুশ
।।মিজানুর রহমান মজুমদার।।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ঘটেছিল বাঙালির ইতিহাস পাল্টে দেয়ার ঘটনা। ‘বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা’স্লোগানে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন রফিক, শফিক, সালাম, বরকত ও জব্বার। ভাষার প্রশ্নে একুশের আন্দোলন হলেও প্রকৃত আন্দোলন হলো শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সম্মিলিত বাঙালির প্রতিবাদ। সেদিন আত্ম-অধিকার, সমতাভিত্তিক সমাজ আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রবিনির্মাণের স্বপ্নে জেগে উঠেছিল তখনকার র্পূব পাকিস্তানের মানুষ। একুশের আন্দোলনেই ঘটে বাঙালরি আত্মবিকাশ, যার ধারাবাহিকতায় জা‌তির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মু‌জিবুর রহমা‌নের  দীর্ঘ সংগ্রামের পথ বেয়ে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে তার নেতৃ‌ত্বে অ‌র্জিত হ‌য়ে‌ছে স্বাধীনতা।

একুশ বাঙালির চেতনার প্রতিক। একুশে  আত্মত্যাগের অহঙ্কারে ভাস্বর মহান একটি দিন। জেগে উঠার প্রেরণা। দেশমাতৃকার প্রয়োজনে আত্মোৎর্সগ করার শপথ গ্রহণের দিন ।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের উদ্ভব। তবে পাকিস্তানের দুই অংশ পূর্ব এবং পশ্চিমের মধ্যে মৌলিকভাবেই বেশ কিছু ভিন্নতা ছিল। বহু জাতি নিয়ে গড়া পাকিস্তানের ৫৪ শতাংশ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। তা স্বত্বেও ৬ শতাংশের উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পায়তারা করেছিল শাসক গোষ্ঠী। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ঘোষনা দেন, উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এতে ক্ষোভে ফেটে পরে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জণগন। তা মেনে না, নিয়ে রাজপথ প্রকম্পিত করে বাঙালি। বাংলা ভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলার রাজপথ। ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন দমাতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। নিষিদ্ধ করা হয় ঢাকা শহরে সকল প্রকার সমাবেশ ও মিছিল। আটক করা হয়েছিল ছাত্র নেতাদের। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি, সকাল থেকে ছাত্ররা এসে জড়ো হতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পূর্ববাংলা আইন পরিষদের দিকে রওয়ানা হয় তারা। পাকিস্তানিদের বুলেট গর্জে উঠল। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার দুর্বার আন্দোলন পাকিস্তানি শাসকদের শংকিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক শহীদ হন। সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ওহী উল্লাহ নামের নয় বছরের এক শিশুও। ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা, ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা মেডিকেলের সামনে জড়ো হতে থাকেন লাখো সাধারণ জনতা। টলে ওঠে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার। জনরোষ ও গণ-আন্দোলনের মুখে, ১৯৫৬ সালে, সংবিধানে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় তারা। রক্ত ঝরলো। ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত হল। আর এর মধ্য দিয়ে বাঙালির নতুন করে আত্মজাগরণ ঘটলো। নিজেদের সত্তা বিপুল গৌরবে ও মহিমায় ঘোষিত হল। এদিন, থেকে বাঙালি আর পেছনে থাকায়নি, এগিয়ে গেছে,অসংখ্য প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের বজ্রঘোষণা উচ্চকিত করে লক্ষ প্রাণের আত্মহুতির অনলশিখা প্রজ্জলিত রেখে।

মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও শাসকগোষ্ঠির প্রভুসুলভ মনোভাবের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং ভাষার ভিত্তিতে বাঙালির জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ।

জাতিসংঘের উদ্যোগে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা-ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়।

সালাম, বরকত, জব্বার, সফিউলসহ আরও নাম না জানা অনেক তরুণের প্রণের বিনিময়ে, আমরা পেয়েছি বাংলা ভাষা। পেয়েছি বাংলায় মা বলে ডাকার অধিকার। তাই জা‌তির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মু‌জিবুর রহমানসহ এইসব ভাষা শহীদদের প্রতি রইল, আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।