Bnanews24.com
Home » মুনিরীয়ার ভণ্ডামী-১১ ( ঝুলন্ত  কোরআন )
বিশেষ সংবাদ

মুনিরীয়ার ভণ্ডামী-১১ ( ঝুলন্ত  কোরআন )

চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার ‘কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফ’। এ দরবারকে ঘিরে গঠিত হয়েছে ‘‌মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’। দু’টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ সৈয়দ তফজ্জল আহমদ। তিনি পবিত্র কুরআন ও হাদীস বিষয়ে  বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এলাকার মানুষকে নামায কায়েম, রোজা, হজ্ব পালন ও জাকাত প্রদানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার আহ্বান জানাতেন। ধর্ম নিয়ে কোন ধরনের গোঁড়ামি, অলৌকিক ক্ষমতার জাহির, প্রচার কোনটাই করেননি।

সৈয়দ তফজ্জল আহমদ এর তিন সন্তান থাকলেও বড় দুই সন্তানকে দরবার থেকে বিতাড়িত করেন কনিষ্ঠপুত্র মুনিরউল্লাহ আহমদী। শায়খ তফজ্জল আহমদ শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে তিনি (মুনিরউল্লাহ) নানা বিতর্কিত, মনগড়া অলৌকিক কেরামত প্রচার করতে থাকেন। সফলও হয়েছেন। এখন মুনিরউল্লাহ আহমদী স্বনামে-বেনামে শতকোটি টাকার মালিক! কী ছিল মুনিরীয়ার দর্শন? কে, কখন, কোথায়, কীভাবে, কাদের কাছে অলৌকিক কেরামত প্রচার করতেন মুনির উল্লাহ আহমদী ও তার সহযোগীরা? তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে কথিত‘‌‌মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’তথা মুনিরউল্লাহ এর ভণ্ডামির নানা তথ্য। বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)’র হেড অব নিউজ ইয়াসীন হীরা’ অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১১ পর্ব 

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ এর সভাপতি মুনিরউল্লাহ ও মহাসচিব মোহাম্মদ ফোরকান মিয়া ভণ্ডামি করতে গিয়ে নানা কৌশলের আশ্রয় নেন। বাদ যায়নি পবিত্র কোরআন ও রাসুল (স:)। মুসলমানরা পবিত্র কোরআন ও রাসুল (স:)কে নিজের জীবনের চেয়ে বেশী শ্রদ্ধা ও ভালবাসেন।মুলমানদের আবেগ, অনুভূতির সবটুকুই পবিত্র কোরআন ও রাসুল (স:)কে ঘিরে। আর ভণ্ডামির জন্য মুনিরউল্লাহ ও ফোরকান মিয়া পবিত্র কোরআন ও রাসুল (স:)কে নিয়ে ভণ্ডামি করতে দ্বিধা করেননি। হাজার হাজার মুরিদদের কোরআন ও রাসুলকে নিয়ে বানোয়াট কল্পকাহিনী প্রচার করেছেন। 

মুনির উল্লাহ-ফোরকান মিয়ার ভাড়াটে মাওলানা সেকান্দর আলীকে দিয়ে এশায়েত সম্মেলন বয়ান করানো হয়। বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি’(বিএনএ) অনুসন্ধানী টিমের কাছে একটি ভিডিও সংরক্ষিত থাকা ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, মাওলানা সেকান্দর আলী কাগতিয়া দরবারের পীর তফজ্জল আহমদ এর অলৈাকিক ক্ষমতার বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৯২ সালে গাউছুল আজম (তফজ্জল আহমদ মুনিরী) মসজিদে মুরিদদের ফয়েজে কোরআন এর নিয়ত করালেন। এরপর একটি কোরআন নিলেন। তখন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। মুরিদরা দেখতে পায় একটি কোরআন ঝুলান্ত অবস্থায় গাউছুল আজমের সামনে হাজির হয়। সেই ঝুলান্ত কোরআন থেকে ফয়েজ দেন মুরিদদের। এ সময় কোরআন থেকে একটি নুর গাউছুল আজমের সিনায় ডুকছে। গাউছুল আজমের সিনা থেকে কিছু নুর মুরিদদের সিনায় ডুকছে।

এখানেই কাহিনীর শেষ নয়- ওই সময় গাউছুল আজমের পাশে একজন নুরানী জাতের লোক দাড়িয়ে ছিলেন। সেই নুরানী জাতের নুরে সমস্ত মসজিদ আলোকিত হয়ে যায়। কে এ নুরানী ব্যক্তি? বলা হয়েছে ওই নুরানী ব্যক্তি মদিনা ওয়ালা, হয়রত মুহাম্মদ মোস্তাফা রসুল (স:)। গাউছুল আজম (তফজ্জল আহমদ মুনিরী) এর ফয়েজে কোরআন এর মাহফিলে উপস্থিত হয়েছেন!

 

 

‘আল হাবীবু মা’আল হাবিবে ফিল ইসরা’য় ১০১ পৃষ্ঠায় লেখা হয়, “২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সাল রাউজান কলেজ ময়দানে অনুষ্ঠিত এশায়েত সম্মেলনে তৎকালীন প্রসিদ্ধ আলিমে দ্বীন ও সুপরিচিত বক্তা ফটিকছড়ি নিবাসী মুহাম্মদ শামশুল আলম হেলালী বলেন, তিনি ১৯৯১ সালে হজ্ব আদায় করে মদীনা শরীফ জিয়ারতে যান। তিনি রওজা পাকে জিয়ারত মোস্তফা আদায়কালে তার ভক্ত ও পরিচিত হাটহাজারী উপজেলার ফতেয়াবাদ নিবাসী আবুধাবীতে অবস্থানকারী একজন যুবক রাসুল (স) যে স্থানে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন সে স্থানে নির্মিত স্তম্ভের পার্শ্বে মেহরাবে তাহাজ্জুদ হযরত ফাতেমা তুজ জোহরা (র.) হুজরা শরীফ সংলগ্ন বারান্দায় নতজানু হয়ে চোখ বন্ধ করে রওজা পাকের দিকে মুখ করে মোরাকাবা অবস্থায় বসা কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (র)কে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, হুজুর! আপনি কি এই ব্যক্তিকে চিনেন?

উত্তরে তিনি বললেন, বাবা!এত লোকের মধ্যে কীভাবে চিনবো? কিন্তু অনেক কষ্ট করে গভীরভাবে দৃষ্টি দিয়ে তিনি চিনতে পারলেন যে, ওই ব্যক্তি আর কেউ নন। তিনি হলেন হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (মুনিরীয়াদের পীর তফজ্জল আহমদ)।

তখন ওই যুবককে উদ্দেশ্য করে বললেন, বাবা! তিনি হলেন, কাগতিয়া মাদ্রাসার বর্তমান প্রিন্সিপাল মুনিরিয়া তরিক্বতের একজন উপযুক্ত পীরে কামেল। যার অনেক মুরিদান, মুহিব্বীন রয়েছে।

তখন যুবকটি বলল, “আপনি তো জেয়ারত করছেন। আমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওই ব্যক্তির তামাশা দেখছি। যা দেখে আমার মুখে জেয়ারত আসছে না। তখন আল্লামা মুহাম্মদ শামশুল আলম হেলালী বললেন,কী হয়েছে আমাকে বল। তখন যুবকটি বলল আমি দেখতে পাচ্ছি তিনি (হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম(র:)যখন চোখ বন্ধ করে এখানে বসেন, তখন তাঁর সিনা(বুক) থেকে একটি রৌশনি গিয়ে রওজা পাকে প্রবেশ করে। আর রওজা মোবারক থেকে একটি রৌশনী এসে তার সিনা মোবারকে (বুকে) প্রবেশ করছে”!

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ এর প্রকাশনা ‘আল হাবীবু মা’আল হাবিবে ফিল ইসরা’য় ১২০ পৃষ্ঠায় আরেক গাউছুল আজমের ‌“আধ্যাত্বিক ক্ষমতার বাস্তবতা” শিরোনামে আরো একটি বানোয়াট কেরামতির লেখা হয়, ‌“১৯৯০ সালে এ মহান মনীষী (তফজ্জল আহমদ) কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফ থেকে ২২ কিলোমিটার দুরে চট্টগ্রাম চাঁনগাও থানার অন্তগর্ত ফয়জুল্লাহ বলীর বাড়ি নিবাসী মরহুম আহমদ হোসেনের স্ত্রী জোবাইদা খাতুনকে তাওয়াজ্জুহ বিল গায়েবের মাধ্যমে ছবক প্রদান করেন। ভদ্র মহিলা প্রায় ২২ কিলোমিটার দূর থেকে এ মহান মনীষীর তাওয়াজ্জুহ পেয়ে বেহুশ হয়ে জায়নামাজে পড়ে যান। তার ছেলে মেয়েরা অনেক চেষ্টা করার পরেও ঐ মহিলা স্বাভাবিক অবস্থায় না ফিরলে যার মাধমে (তরিকত্বের জনৈক মাওলানা যিনি ঐ বাড়িতে লজিং থাকতেন)ঐ মহিলা এ মহান মনীষীর তরিকত্বতের দীক্ষা পেয়েছেন তার উপর  রাগান্বিত হয়ে গেলেন এবং তাকে শাররিকভাবে লাঞ্চনা করার প্রতিজ্ঞা করেন।

এদিকে এ মহান মনীষী পরের দিন ফজরের নামাজ, দীর্ঘক্ষণ মোরাকাবা ও ইশরাকের নামাজ আদায় করে ঐ ব্যক্তিকে ডেকে বললেন ‘হে অমুক! তুমি তাড়াতাড়ি চান্দগাও থানার ফয়জুল্লাহ বলীর বাড়িতে চলে যাও। ছবকপ্রাপ্ত মহিলা তরিক্বতপন্থী জোবাইদা খাতুন গতকাল থেকে এখনো বেহুশ অবস্থায় আছে। তুমি সেখানে গিয়ে তরিক্বতের নিয়ম মোতাবেক তাকে ছুলুকিয়তে আনার চেষ্টা করো’ এ কথা শুনে ঐ ব্যক্তি নিজ বাড়িতে না গিয়ে ফয়জুল্লাহ বলীর বাড়িতে চলে যান। তাকে দেখে জোবাইদা খাতুনের ছেলেরা লাঞ্চনা করার উপক্রম হলে তিনি তাদেরকে শান্ত করলেন এবং গাউছুল আজমের নির্দেশনা অনুয়ায়ি জোবাইদা খাতুনকে তাওয়াজ্জুহ বিল গায়েবের মাধ্যমে বেহুশ অবস্থা থেকে হুশে নিয়ে আসেন!

প্রশ্ন হচ্ছে, চট্টগ্রাম মহানগরে বসবাসকারি একজন মহিলা মাগরিব থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত বেহুশ (অজ্ঞান) হয়ে পড়ে আছেন। কিন্তু এ মহিলাকে কোন হাসপাতাল, ক্লিনিকে নেয়া হলো না! ২২ কিলোমিটার দূরে রাউজানের কাগতিয়া দরবার থেকে অলৌকিকভাবে মুনিরীয়ার পীর জ্ঞান ফিরিয়ে দিলেন!

ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষকগণ মতে, উল্লেখিত ঘটনা সমূহ মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ এর সভাপতি মুনিরউল্লাহ ও মহাসচিব মোহাম্মদ ফোরকান মিয়ার পরিকল্পিতভাবে বানানো কল্পকাহিনী। তারা কখনো বলেছেন তাদের পীর তফজ্জল আহমদ মুনিরী বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় মক্কায় মসজিদে হারামে নামাজ আদায় করেছেন, আবার রসুল (স:) তার বাড়ির কাছে মসজিদে উপস্থিত হয়েছেন। কখনো বলেছেন, গায়েবি ক্ষমতার মাধ্যমে বেহুশ (অজ্ঞান)কে হুশ (জ্ঞান)ফিরিয়ে দিয়েছেন।

শায়খ তফজ্জল আহমদ মুনিরী এর সিনা (বুক) থেকে রসুল (স:)এর রওজায় ‘রৌশনি’ যাচ্ছে, আবার পাল্টা ‘রৌশনি রসুল (স:) এর রওজা থেকে তার সিনায় (বুকে) আসছে। মুসজিদে গায়েবিভাবে ঝুলান্ত কোরআন এসেছে। একই সঙ্গে স্বশরীরে রাসুল (স:) মাহফিলে উপস্থিত হয়েছেন। গায়েবি পদ্ধতিতে অজ্ঞান ব্যক্তিকে জ্ঞান ফিরিয়ে দেয়া ইত্যাদি মুনিরীয়ার ভণ্ডামি’র বড় উদাহরণ। কথিত কেরামতির ইসলামিক ও বিজ্ঞান ভিত্তিক কোন ব্যাখা নেই।

আগের পর্ব পড়তে কিক্লক করুন

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১০ ( রাসুল (স:) সঙ্গে দৈনিক সাক্ষাৎ!

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৯ (তাজে গাউছিয়্যত )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৮(খেলাফতের স্বাক্ষী যারা)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৭(ভ্রান্ত যত মতবাদ)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৬

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৫

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৪
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৩
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-২
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১