কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৫

আবার কারাগারের ক্ষুদ্র কুঠুরিতে ফিরে এসে অপেক্ষা করতে থাকি জমাদার সাহেবের আগমনের জন্য। তালাবন্ধ হতে হবে। যথারীতি আমার গুহার মধ্যে রাতের জন্য শুভাগমন করিয়া ‘তৃপ্তির’ নিশ্বাস ফেললাম । যেদিন বাচ্চাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়, ওরা চলে যাবার পরে মন খারাপ লাগে ।

আরো পড়ুন

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৭

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৬

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৪

আমাদের মতো ‘দাগী দেরও মন খারাপ হয় পরে আবার ঠিক হয়ে যায়।

১৬ই জুন ১৯৬৬ ॥ বৃহস্পতিবার

ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম ইত্তেফাক কাগজের কোনো এক বড় অফিসারকে গ্রেপ্তার করে এনেছে ভাবলাম কে হবে, মানিক ভাই ছাড়া ! খবর কেহই সঠিক বলতে পারছে না। পাগলের মতো সকলকেই জিজ্ঞাসা করলাম । কেহই ঠিক মতো বলতে পারে না এমনভাবে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল । আমি চুপ করে বসে আছি, খবর আমাকে জানতেই হবে । বুঝতে পেরেছি মানিক ভাই, কিন্তু পাকাপাকি খবর পাচ্ছি না। একটু পরেই একজন বলল, ‘তফাজ্জল হোসেন সাহেবকে ভোরবেলা নিয়ে এসেছে। ১০ নম্বর সেলে রেখেছে’ । আমার মনে ভীষণ আঘাত লাগল খবরটায়। এরা মানিক ভাইকেও ছাড়ল না? এরা কতদূর নেমে গেছে । পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে তাঁর স্থান খুবই উচ্চে । তাঁর কলমের কাছে বাংলার খুব কম লেখকই দাঁড়াতে পারে বিশেষ করে তাঁর রাজনৈতিক সমালোচনার তুলনাই হয় না । তাঁর নিজের লেখা ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’, পড়লে দুনিয়ার অনেক দেশের রাজনৈতিক অবস্থা বুঝতে সহজ হয় সাধারণ লোকেরও তাঁর লেখা বুঝতে কষ্ট হয় না । তাঁকে এক অর্থে শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী বলা যেতে পারে ।

তিনি কোনোদিন সক্রিয় রাজনীতি করেন নাই । তাঁর একটি নিজস্ব মতবাদ আছে । সত্য কথা বলতে কাহাকেও তিনি ছাড়েন না । আইয়ুব খান সাহেব ও

কারাগারের রোজনামচা | ৯৫

তাঁকে সমীহ করে চলেন তিনি মনের মধ্যে এক কথা আর মুখে এক কথা বলেন না তিনি হঠাৎ রেগে যান, আবার পাঁচ মিনিট পরে শান্ত হয়ে পড়েন । কেহ ভাবতেই পারবেন না তাহার মুখ খুবই খারাপ, মুখে যাহা আসে তাহাই বলতে পারেন । অনেক সময় আমার তাঁর সাথে মতের অমিল হয়েছে। গালাগালি ও রাগারাগি করেছেন, কিন্তু অন্য কেহ আমাকে কিছু বললে, আর তার রক্ষা নাই, ঝাঁপাইয়া পড়েন । আমাকে তিনি অত্যধিক স্নেহ করেন আমিও তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করি কোনো কিছুতে আমি সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে তাঁর কাছে ছুটে যাই তিনিই আমাকে সঠিক পথ দেখাইয়া দেন । সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মৃত্যুর পরে তাঁর কাছ থেকেই বুদ্ধি পরামর্শ নিয়ে থাকি । কোনো লোভ বা ভ্রুকুটি তাকে তাঁর মতের থেকে সরাতে পারে নাই ৷ মার্শাল ল’র সময়ও তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে নেওয়া হয় সোহ্রাওয়ার্দী সাহেবকে গ্রেপ্তার করার পরেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় আবার আজও তাঁকে গ্রেপ্তার করে এনেছে । তাঁর উপর অনেকেরই ঈর্ষা এবং আক্রোশ রয়েছে।

সূত্র: কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা -৯৫-৯৬, লেখকঃ শেখ মুজিবুর রহমান, প্রকাশকালঃ ফাল্গুন ১৪২৩/ মার্চ ২০১৭

আরও পড়ুন :

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৪

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৩

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬২

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬১
কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬০

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৯

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৮

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৭

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৬

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৫

গ্রন্থনা ও পরিকল্পনাঃ ইয়াসীন হীরা, সম্পাদনাঃ হাসিনা আখতার মুন্নী