কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৪

রাশেদ মোশাররফ ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক । আমার বাড়ির কাছে থাকে।  তাহার বিবাহের তারিখ ১২ই জুন ঠিক ছিল, বিবাহের কার্ডও ছাপান হয়েছিল। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে আনা হয়েছে । রেণু দুঃখ করে বলল, সে তো বিবাহ নিয়াই ব্যস্ত ছিল, তাকে যে কেন ধরে এনেছে! এদের গ্রেপ্তারের কোনো তাল নাই।  ছোট ছোট দুধের বাচ্চাদের ধরে নিয়ে এসেছে রাস্তা থেকে, রাতভর মা মা করে কাঁদে।  একজন মহিলা, এক ভদ্রলোকের বাড়িতে কাজ করে । এরই মাধ্যমে সংসার চালায়, বড় গরিব।  তার ছয় বৎসরের ছেলেকে নিয়ে চলেছে সেই বাড়িতে কাজ করতে।   গাড়ি থামাইয়া পুলিশ ডাক দেয়, এই ছেলে শোন।  ছেলেটি এগিয়ে গেছে, তাকেও গাড়িতে উঠাইয়া নিয়েছে মহিলাটি চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেছে।  কে কার কথা শোনে! একেবারে জেলে নিয়ে এসেছে। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে মোনায়েম খান সাহেবের দৌলতে।

আরো পড়ুন

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৭

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৬

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৫

প্রায় এক ঘণ্টা রেণু এবং আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ছিলাম। সংসারের ছোটখাট আলাপ । ওদের বলেছি আর কোনো কষ্ট নাই; একাকী সঙ্গীবিহীন আছি । মানিক ভাইকে বলতে বললাম, তিনি যেন চীফ সেক্রেটারিকে বলেন কেন এই অত্যাচার? আমার স্ত্রী বলল, মানিক ভাইর সাথে দেখা করব। সাক্ষাতের সময় শেষ হয়ে গেছে আর দেরি করা চলে না। তাই বিদায় দিলাম ওদের । রাসেলকে গাড়ির কথা বলে কামালের কাছে দিয়ে সরে এলাম।

কে বুঝবে আমাদের মতো রাজনৈতিক বন্দিদের বুকের ব্যথা । আমার ছেলেমেয়েদের তো থাকা খাওয়ার চিন্তা করতে হবে না এমন অনেক লোক আছে যাদের স্ত্রীদের ভিক্ষা করে, পরের বাড়ি খেটে, এমনকি ইজ্জত দিয়েও সংসার চালাতে হয়েছে । জীবনে অনেক রাজবন্দির স্ত্রী বা ছেলেমেয়ের চিঠি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে । সে-করুণ কাহিনী কল্পনা করতেও ভয় হয় ।

যারা স্বার্থের জন্য আমাদের বৎসরের পর বৎসর কারাগারে বন্দি করে রেখেছ –কিছুদিন যে ক্ষমতায় ছিলাম তখন তাদের কাহাকেও গ্রেপ্তার করে জেলে বন্দি করে রাখি নাই। এমনকি জেলগেটে এসে রাজবন্দিদের মুক্তি দিয়েছিলাম ।

এখানকার স্বৈরশাসকদের বি. টীম ও সি. টীম এখন অন্য ভোল্ ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত । তারাই আজ জুলুম করছে আমাদের উপর । যদি কিছুদিনের জন্য জেল দিয়ে সেলের মধ্যে ২৪ ঘণ্টা দরজা বন্ধ করে রেখে একবার লছমি খাবার দিতাম, তবে জীবনেও আর রাজনীতির নাম নিত না। জেল বন্দি করার সাথে বন্ড দিয়া বাহির হয়ে যেত অথচ এমন অনেক রাজবন্দি এখনও জেলে আছে, যারা প্রায় অন্ধ হয়ে গেছে; হাঁটতে চলতেও পারে না, খেয়ে হজম করতেও পারে না। প্রায় ১৩/১৪ বৎসর পাকিস্তান হওয়ার পরেই জেলে আছে । তারা জানে জেলেই তাদের মরতে হবে বোধ হয়, তবুও বন্ড দেয় নাই । এই সমস্ত ত্যাগী রাজনৈতিক নেতাদেরও আমরা শ্রদ্ধা করি । এঁদের উপর যারা জুলুম করে, তারা কত বড় নিষ্ঠুর হতে পারে তা ভাষায় প্রকাশ করা কষ্টকর আমার ভাষা নাই তাই লিখতে পারলাম না

সূত্র : কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ৯৪-৯৫, লেখকঃ শেখ মুজিবুর রহমান, প্রকাশকালঃ ফাল্গুন ১৪২৩/ মার্চ ২০১৭

আরও পড়ুন :

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬৩

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬২

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬১
কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৬০

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৯

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৮

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৭

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৬

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৫

গ্রন্থনা ও পরিকল্পনাঃ ইয়াসীন হীরা, সম্পাদনাঃ হাসিনা আখতার মুন্নী