কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৫

খাবার পানি তো কোনো ট্রেনেই পাওয়া যায় না। পায়খানা প্রস্রাব করার পানিও অনেক সময় থাকে না। কোন মন্ত্রী যেন বলেছেন ‘সাবোটাস’! ঠিকই বলেছেন, সাবোটাস তো নিশ্চয়ই, কারণ কেন্দ্রীয় সরকারই ‘সাবোটাস’ করেছে দীর্ঘ ১৭ বৎসর।

আরো পড়ুন

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৭

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৬

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৪

ভারতবর্ষ যখন ভাগ হয় এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন কায়েম হয় তখন রেলওয়ের ক্ষতিপূরণ পাওয়া গিয়েছিল সংখ্যানুপাতে । পূর্ব বাংলা টাকা বেশি পেয়েছিল ভাগে । দুঃখের বিষয়, যতদূর পশ্চিম পাকিস্তান রেলওয়ের উন্নতি হওয়া প্রয়োজন ছিল তাহা করে নিয়ে পূর্ব বাংলার রেলওয়ে আলাদা করে প্রদেশের হাতে দেওয়া হলো। সেই পরিমাণ ক্ষতিপূরণ কি দেওয়া হয়েছে? ভাল ভাল ইঞ্জিন ও বগিগুলি পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে নেওয়া হয় । কতগুলি নিয়েছে তার হিসাব কি তারা দিয়েছে? আজ পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি ডাবল লাইন করা হয় নাই

পশ্চিম পাকিস্তানে যেয়ে দেখুন কত বাহার । বিরোধী দল ও স্বতন্ত্রদল পূর্ব বাংলার আইন পরিষদের কক্ষ ত্যাগ করেছেন রেল দুর্ঘটনার মুলতবি প্রস্তাব অবৈধ ঘোষণার প্রতিবাদে। মুলতবি প্রস্তাব করে কেন এরা! বলবে, ডিবেট করবে, চলে আসবে মাহিনা ও পাসগুলি থাকলেই তো চলে! চমৎকার আইন সভা! দুনিয়ায় এর নজির নাই ।

এ তো ‘মৌলিক গণতন্ত্র’, এর সৃষ্টিকর্তা জনাব আইয়ুব খান। নিজকে পাকাপাকিভাবে ক্ষমতায় রাখার ব্যবস্থা। জনগণের কি প্রয়োজন এতে? মৌলিক গণতন্ত্রী আছে, টাকা আছে, সরকারি কর্মচারী আছে। আইয়ুব সাহেব আছেন ক্ষমতার শীর্ষে আর তাঁর দুই ছোট লাট মোনায়েম খান সাহেব আর পশ্চিম পাকিস্তানে কালাবাগের খান সাহেব তো আছেন । চিন্তা কি?

সিলেটে ভয়াবহ বন্যায় বহু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার অনেক জায়গায় ঝড়েও যথেষ্ট মানুষ মারা গেছে ও ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে জানি না সরকারি সাহায্য কত পরিমাণ পৌঁছাবে। সরকারি সাহায্যের নমুনা আমার জানা আছে, কারণ কক্সবাজারে ধ্বংসলীলা আমি দেখে এসেছি।

বিকালে হাসপাতালের দিকে চেয়ে দেখতে পাই শাহাবুদ্দিন চৌধুরী আমার দিকে চেয়ে আছেন । তাঁকে সালাম দিলাম এবং তাড়াতাড়ি সুস্থ হউন এই কামনা করলাম । বহুদূর, কথা বললে শুনবে না, আর বলাও উচিত নয়, আইনে বাধা আছে । দেখি বাদশা মিয়া (বাবু বাজারের) আমাকে সালাম দিচ্ছে। বেচারা জেল খাটতে খাটতে শেষ হয়ে গেল । তার শক্তি ও টাকাই তার কাল। বাদশা মিয়ার পিছনে দাঁড়াইয়া অনেকে আমাকে পিঠ দেখাল কেমন করে পুলিশ অত্যাচার করেছে। অনেকের মাথায় ব্যান্ডেজ, আহত হয়ে হাসপাতালে আছে। শুনলাম প্রায় ৪০/৫০ জন হাসপাতালে আছে। ক্ষোভে দুঃখে মনে মনে বললাম, ‘মার খাও। তোমাদের জাত ভাইয়ের লাঠির বাড়ি ও বন্দুকের গুলি খাও। জেল জুলুম তোমাদের কপালে আছে । কারণ তোমরা তো পরাধীন বাঙালি জাতি। পরাধীন জাতের কপালে এমন লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা হয়েই থাকে । এতে আর নতুনত্ব কি?

লেখাপড়া করতে ইচ্ছা হয় না। সময়ও কাটে না, জেলে রাতটাই বেশি কষ্টের। আবার যারা আমার মতো একাকী নির্জন স্থানে থাকতে বাধ্য হয়-যাকে ইংরেজিতে বলে ‘Solitary Confinement – তাদের অবস্থা কল্পনা করা যায় না।

সূত্র: কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ৮২-৮৩, লেখকঃ শেখ মুজিবুর রহমান, প্রকাশকালঃ ফাল্গুন ১৪২৩/ মার্চ ২০১৭

আরও পড়ুন :

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৪

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫৩

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫২

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫১

কারাগারের রোজনামচা : পর্ব-৫০

গ্রন্থনা ও পরিকল্পনাঃ ইয়াসীন হীরা, সম্পাদনাঃ হাসিনা আখতার মুন্নী