বিএনএ, ডেস্ক : চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে বছরে মোট ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০টি বিদেশী জাহাজ আসে। অধিকাংশ বড় কন্টেইনার জাহাজ এবং মাদার ভ্যাসেল সাধারণত সিঙ্গাপুর, কলম্বো বা দুবাই থেকে জ্বালানি নিয়ে আসে। ৮০০ থেকে ১,০০০টি পণ্যবাহী বিদেশী জাহাজ বাংলাদেশ থেকে আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি সংগ্রহ করে। মূলত, যে সব বাল্ক ক্যারিয়ার বা জেনারেল কার্গো জাহাজ বহির্নোঙরে ১০-১৫ দিন অবস্থান করে পণ্য খালাস করে, তাদের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে তারা বেসরকারি বাঙ্কার সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান থেকে Marine Gas Oil (MGO) এবং Low Sulphur Fuel Oil (LSFO) সংগ্রহ করে থাকে। মোট বাঙ্কারিং চাহিদার প্রায় ৯০% চট্টগ্রাম বন্দর ও বহির্নোঙর থেকে সরবরাহ করা হয়। মোংলা বন্দরে জাহাজ আগমনের সংখ্যা কম হওয়ায় সেখানে বাঙ্কারিংয়ের পরিমাণও তুলনামূলক অনেক কম।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বর্তমানে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। বিদেশি পণ্যবাহী জাহাজগুলোতে জ্বালানি তেল সরবরাহে স্থানীয় বাঙ্কারিং প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে বন্দরটির ভাবমূর্তি চরম সংকটে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলো চট্টগ্রামকে ‘নো-বাঙ্কারিং পোর্ট’ বা জ্বালানিহীন বন্দর হিসেবে ঘোষণা করতে পারে।
শিপিং এজেন্টদের মতে, কোনো বন্দর যদি টানা কয়েক সপ্তাহ আগত জাহাজগুলোকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি দিতে ব্যর্থ হয়, তবে আন্তর্জাতিকভাবে সেটিকে ‘নো-বাঙ্কারিং পোর্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে অনেক বিদেশি ফিডার জাহাজ চট্টগ্রামে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জ্বালানির অভাবে বহির্নোঙরে জাহাজ আটকে থাকলে প্রতিদিন হাজার হাজার ডলার ডেমারেজ গুনতে হয় আমদানিকারকদের।
দেশের প্রায় ১০০টি লাইসেন্সধারী বাঙ্কারিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সচল থাকা ২০-২৫টি প্রতিষ্ঠান জাহাজকে চাহিদামতো জ্বালানি দিতে পারছে না। এর মূল কারণ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) গত কয়েক সপ্তাহে বাঙ্কারিং এজেন্টদের কাছে জ্বালানি তেল (বিশেষ করে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল) সরবরাহ প্রায় ৩০-৪০% কমিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ও বহির্নোঙরে অবস্থানরত অর্ধশতাধিক বিদেশি বাল্ক ক্যারিয়ার ও কন্টেইনার জাহাজ জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশ বাঙ্কার সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো: জাকির হোসেন জানান, “আমাদের কাছে প্রতিদিন ১০-১৫টি জাহাজের জ্বালানির চাহিদা আছে, কিন্তু আমরা একটি জাহাজকেও পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ দিতে পারছি না। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে বিদেশি জাহাজ গুলো বাংলাদেশ থেকে মূখ ফিরিয়ে নিবে। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। জাহাজগুলোকে কলম্বো বা সিঙ্গাপুর থেকে বাড়তি জ্বালানি নিয়ে আসতে হবে, যা পণ্য আমদানির ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
চট্টগ্রাম বন্দরকে এই আন্তর্জাতিক লজ্জা থেকে বাঁচাতে হলে বিপিসি-কে বাঙ্কারিং খাতের জন্য বিশেষ কোটা বরাদ্দ করতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ বাঙ্কার সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশনের এই নেতা।
জাকির হোসেন আরও জানান, শুধু বিদেশ থেকে আগত জাহাজ নয়- বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত অন্তত: ৫ হাজার লাইটার জাহাজ, মাছ ধরার ট্রলারসহ সাড়ে ৬ হাজারের বেশি বিভিন্ন নৌযান কর্ণফুলী নদী, বঙ্গোপসাগর মোহনা এবং দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় দুই সপ্তাহ ধরে নোঙ্গর করে আছে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) থেকে পণ্য খালাস করে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে নেওয়ার জন্য প্রতিদিন প্রায় ২০০-৩০০টি লাইটার জাহাজ প্রয়োজন হয় । কিন্তু জ্বালানি স্বল্পতায় বর্তমানে মাত্র ৩০-৪০টি জাহাজ নিয়মিত চলাচল করতে পারছে । রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ডিপোগুলো থেকে চাহিদামতো সরবরাহ না পাওয়ায় অনেক জাহাজ পণ্য বোঝাই থাকা সত্ত্বেও কর্ণফুলী নদীতে ভাসছে এবং গন্তব্যে যেতে পারছে না। ফলে জাহাজগুলো খালাস না হতে পেরে ‘ফ্লোটিং ওয়্যারহাউস’ বা ভাসমান গুদামে পরিণত হচ্ছে। তাছাড়া মাদার ভেসেলগুলো অতিরিক্ত সময় অবস্থানের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১২,০০০ ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুনছে।
বহির্নোঙরে কয়েক ডজন মাদার ভেসেল পণ্য নিয়ে অপেক্ষায় থাকলেও লাইটার জাহাজের অভাবে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। এর ফলে বাজারে চাল, গম, চিনি এবং সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ইতিমধ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় আমদানি পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে জনজীবনে।
এ দিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জরুরি বৈঠক করেছে। তারা দাবি করছে, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাহিরে যায়নি এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি ও গ্যাসবাহী জাহাজগুলোকে জেটিতে ভিড়ানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে ডিস্ট্রিবিউশন চেইনে সমস্যার কারণে প্রান্তিক পর্যায়ে জাহাজগুলো তেল পাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এই বন্দরের বাঙ্কারিং সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে, আন্তর্জাতিক নৌ-রুট থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। তাই ‘নো-বাঙ্কারিং পোর্ট’ তকমা পাওয়ার আগেই সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে মাছ ধরার নৌযানের সংখ্যা প্রায় ৬৭ হাজার। এই সব নৌযান এখন ডিজেল সংকটের কারণে মৎস্য শিকার বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। ফলে মৎস্য খাতে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চরম অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে কয়েক লাখ জেলে এবং তাদের পরিবার। দেশে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ না থাকায় মাছের বাজারে যেন আগুন লেগেছে। সাধারণ মানুষ মাছ ছাড়াই বাড়ি ফিরছে। ফলে ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালী’ প্রবাদটি এখন কথার কথায় পরিণত হয়েছে।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

