29.1 C
আবহাওয়া
১:২৭ পূর্বাহ্ণ - জুন ১৫, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » কেমন হবে বিএনপি’র ‘তৃতীয়’ ভুলের পরিণতি? 

কেমন হবে বিএনপি’র ‘তৃতীয়’ ভুলের পরিণতি? 


বিএনএ ডেস্ক : ১৯৯০ সালে এরশাদ বিরোধী গণ আন্দোলনের পর  তিন দলীয় জোটের রূপ রেখার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আহমেদ। পরবর্তীতে  ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন।  ৩০০টি আসনের বিপরীতে ৪২৪জন সতন্ত্র প্রার্থীসহ ৭৫টি দল থেকে মোট ২৭৮৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়।

YouTube player

নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ১৪০টি আসনে বিজয়ী হয় । শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় ৮৮টি আসনে, কারাগারে থাকা এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বিজয়ী হয় ৩৫টি আসনে । কিন্ত সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫১টি আসন। জামায়াতে ইসলামীর নি:শর্ত  ১৮ আসনের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।

১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ মাগুরা-২ উপ-নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপির অভিযোগে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক  সরকারের প্রতি জোরালো সমর্থন জানায়। ১৯৯৪ সালের জুন মাসে একটি সম্ভাব্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য ২৭শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় সীমা নির্ধারণ করে দেয়।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বিএনপির নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি কেবল নাকচই করেননি, বরং পুরো ধারণাটি নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নানা রকম বক্তব্য দেন। এই অবস্থায়  ১৯৯৪ সালের ২৮শে ডিসেম্বর সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৪৭ জন সংসদ সদস্য।

কিন্তু  পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে স্পিকার শেখ আবদুর রাজ্জাক তাদেরকে অনুপস্থিত হিসেবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত দেন। অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতির ৯০ কার্যদিবস পূরণ হওয়ার পর সংবিধানের বিধি মোতাবেক ১৯৯৫ সালের ৩১শে জুলাই সংসদীয় আসনগুলো শূন্য ঘোষণা করা হয়।

বিরোধী দলের ডাকা টানা হরতাল ও অবরোধের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি ৬ষ্ট সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। কিন্তু বিএনপি- ফ্রিডম পার্টি  ছাড়া কোন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয় নি। ভোটার বিহীন অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮, স্বতন্ত্র ১০, ফ্রিডম পার্টিকে ১টি আসনে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ১১টি আসনে  নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত থাকে। সংসদের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন লে. অবসর প্রাপ্ত কর্নেল  খন্দকার আবদুর রশিদ।

মাত্র ১১ দিনের মেয়াদের এই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ করে সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে বিএনপি। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির শোচনীয় পরাজয় হয়। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় ফিরে আসে বিএনপি। কিন্তু ২০০৬ সালে   প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে বয়স বাড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বানাতে গিয়ে বিএনপিকে চরম মূল্য দিতে হয়। সেনা সমর্থিত সরকারের আগমন ঘটে। তখন থেকে ক্ষমতা বলয়ের বাহিরে থাকে বিএনপি।

১৯৯৬ সালের প্রথম ভুল এবং ২০০৬ সালের দ্বিতীয় ভুল থেকে শিক্ষা নেয়নি বিএনপি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়  আওয়ামী লীগ বিহীন  ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ২১২ আসন নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়  বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতায় বসেই তারা তীব্রভাবে অহংকারী হয়ে ওঠে। পুরানো পথে হাটতে থাকে টানা ১৭ বছর নির্যাতনের শিকার দলটি। জুলাই সনদ ও গণভোটকে পাশ কাটিয়ে এখন সংবিধান সংবিধান করে মুখে ফেনা তুলছেন। ঠিক ১৯৯৬ এবং ২০০৬ সালেও একই কাজ করেছে এমন অভিযোগ করেছে জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

প্রত্যেক ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে, এটি নিউটনের তৃতীয় সূত্র। রাজনীতির বেলায়ও এই তৃতীয় সূত্র সব সময় কার্যকর। একটি  ভুল সিদ্ধান্ত দলকে বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। যেমনটা অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বেলায় ঘটেছে।

অনেকে মনে করেন, বিএনপি বিগত দিনে সব সময় একটি বিশেষ কারণে ভোট পেয়েছে, আর তা হচ্ছে—নৌকা ঠেকাতে ধানের শীষ। কখনোই নিজস্ব আদর্শিক শক্তির ভিত্তিতে ক্ষমতায় আসতে পারেনি এই দলটি। বিএনপি সব সময় অন্যের সহায়তার উপর নির্ভর করতে পছন্দ করে। এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে হঠাতে আওয়ামী লীগের সহায়তা চায় বিএনপি এবং অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে ‘নিষেধজ্ঞা’ দিয়েছে তা প্রত্যাহার করে নিবেন এমন ‘মুলা’ ঝুলিয়ে দেন। বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়ে আওয়ামী লীগগের  নিষেধাজ্ঞা অধ্যাদেশ বিল পাশ করেই ক্ষান্ত হয়নি সংশোধনী এনে শাস্তির বিধানও করেছেন । এতে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক ময়দান থেকে সরিয়ে দেওয়ার সম্পূর্ণ দায় বিএনপির ওপর বর্তাচ্ছে।

প্রসঙ্গত  চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণে বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী  তারেক রহমান বলেছিলেন, নীতিগতভাবে কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয  তার দল। তিনি বলেন, ‘আজ যদি একটি দল নিষিদ্ধ করা হয়, তবে কাল আমার দলও নিষিদ্ধ হবে। কিন্তু সিংহাসনে বসে তিনি উল্টোটাই করলেন। শুধু কী আওয়ামী লীগের বেলায় ‘কথা খেলাপী’ হয়েছেন তারেক রহমান ও তার দল বিএনপি?

না, তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রচার চালাতে গিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ এর  পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন, সেই জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়নে আগ্রহী নয় তিনি বা তার  দল বিএনপি। ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বাতিল  বা আংশিক বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি এখন তাদের তৃতীয় ভুলটি করেছে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা বহাল এবং  ১৬টি অধ্যাদেশ পাশ না করার মাধ্যমে। বিএনপি পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার  কর্মপরিকল্পনা বাদ দিয়ে ১০–১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েছে। ফলে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তো দূরের কথা, পাঁচ বছর টিকে থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কেননা, এই সংসদ ততদিন টিকে থাকবে, যতদিন জামায়াত ও এনসিপি তা টিকিয়ে রাখতে চাইবে। তৃতীয় ভুলটি ‘ ওয়াদা  খেলাপি’ বিএনপিকে  ১৯৯৬ সাল বা ২০০৬ সালের ভুলের দিকে নিয়ে যেতে পারে এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

শামীমা চৌধুরী শাম্মী

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ