25 C
আবহাওয়া
৩:১৭ অপরাহ্ণ - মে ২৫, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » কেমন হবে এনসিপির নাহিদ ও বিএনপির কাইয়ুমের ভোটের লড়াই?

কেমন হবে এনসিপির নাহিদ ও বিএনপির কাইয়ুমের ভোটের লড়াই?


বিএনএ, ঢাকা : “ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়” এটি বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদ, যার অর্থ হলো—’যেমন কর্ম, তেমন ফল’ বা অপরের ক্ষতি করলে নিজেরও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দ্বৈত নাগরিকত্ব ও তথ্য গোপনের অভিযোগে ঢাকা-১১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুমের প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র রিপাবলিক অব ভানুয়াতু’র নাগরিকত্ব গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে দিলে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করেন এনসিপির আহ্বায়ক। যা শুনানীর অপেক্ষায় রয়েছে।

তার একদিন পরই জানা গেল নাহিদ ইসলাম ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট উপদেষ্টা পরিষদের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহার করে ২০২৫ সালের ২০শে এপ্রিল ক্যারিবীয় দ্বীপ রাষ্ট্র ‘কমনওয়েলথ অব ডোমিনিকান রিপাবলিক’এর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। এখানে শেষ নয়- ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের প্রার্থিতা স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। দ্বৈত নাগরিকের অভিযোগ তুলে ৯ ফেব্রুয়ারি এ রিট করেন ঢাকা-১১ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামীম আহমেদ। রিটে বলা হয়, নির্বাচনী হলফনামায় তিনি তা গোপন করেন, যা সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২(গ) সরাসরি লঙ্ঘন। যা নির্বাচনের অযোগ্য।

এদিকে ৮ই ফেব্রুয়ারি বাড্ডায় জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১-দলীয় নির্বাচনি জোটের এক সমাবেশে শহীদ ওসমান হাদির বোন পরিচয়ে এক নারীর বক্তব্য দেওয়া নিয়ে রহস্য ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। শবনম খাদিজা নামের ওই নারী জনসভায় নাহিদ ইসলামের পক্ষে ভোট চাইলেও শহীদ হাদির পরিবার দাবি করেছে—ওই নারী তাদের পরিবারের কেউ নন।

নির্বাচনি ওই সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে শবনম খাদিজা নিজেকে ওসমান হাদির বোন হিসেবে পরিচয় দিয়ে নাহিদ ইসলামকে শাপলাকলিতে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

ওই নারীর ভাষণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন শহীদ ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা। সেখানে তিনি ওই নারীকে ‘ভুয়া’ বলে উল্লেখ করে তীব্র প্রতিবাদ জানান।

ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের ওসমান হাদির স্ত্রীর এই পোস্টটি শেয়ার করেন। সেখানে তিনি মন্তব্য করেন, “পরিবারের দেওয়া তথ্যমতে, বক্তব্য দেওয়া ওই নারী হাদি ভাইয়ের তিন বোনের কেউ নন। ফলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। নেকাব পড়া এ নারীকে অনেকে ভাড়াটে বক্তা বলে অবহিত করেছে।

এবার চোখ ফেরানো যাক, ঢাকা-১১ আসনের নির্বাচনে। রামপুরা বাড্ডা, বনশ্রী ভাটারা ও সবুজবাগের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনে বর্তমানে মোট ভোটার ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২২ হাজার ৮৭৭ জন। নারী ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ জন। তৃতীয় লিঙ্গের তিনজন ভোটার রয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১০জন প্রার্থী
ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি ড. এম এ কাইয়ুম। জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১ দলীয় প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম । হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফজলে বারী মাসউদ। ফুটবল প্রতীকে স্বতন্ত্র কহিনূর আক্তার বীথি, ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের মো. আরিফুর রহমান, উদিয়মান সুর্য প্রতীকে গণফোরামের মো. আবদুল কাদের, ছড়ি প্রতীকে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের কাজী মো. শহীদুল্লাহ, হাতি প্রতীকে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. জাকির হোসেন, আম প্রতীকে ন্যাশনাল পিপলস্‌ পার্টির মো. মিজানুর রহমান, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির শামীম আহমেদ। মূলত ভোটের লড়াই হবে বিএনপির এম এ কাইয়ুম ও এনসিপির নাহিদ ইসলামের সঙ্গে। কেমন হবে এই দুই জনের ভোটের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে নিই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের আগে এই আসনটি ঢাকা ৯ সংসদীয় আসনের অংশ ছিল।

১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩ শত ৫০ জন। ভোট প্রদান করেন ৯৩ হাজার ৭ শত জন। নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৫৫ হাজার ৯ শত ৪৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের সাজেদা চৌধুরী। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ২৯ হাজার ৪ শত ৬৪ ভোট। বেগম জিয়া এই আসনটি ছেড়ে দিলে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে বিএনপির জমির উদ্দিন সরকার বিজয়ী হন।

১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬ শত ৫৭ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৯০ হাজার ১১ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মকবুল হোসেন বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৮৪ হাজার ১ শত ৫০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির মীর শওকত আলী। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৭৫ হাজার ৮ শত ৫৫ ভোট।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫ শত ২৪ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ২১ হাজার ৬ শত ৫১ জন। নির্বাচনে বিএনপির খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ২৬ হাজার ৯ শত ৮৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মকবুল হোসেন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৮৬ হাজার ৯ শত ৮ ভোট।

২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৯৬ হাজার ৬ শত ২৭ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ১৬ হাজার ৭৯ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগর আসাদুজ্জামান খান বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৩০ হাজার ৫ শত ৭৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির মো: সাহাব উদ্দীন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৭৩ হাজার ৭ শত ৮০ ভোট।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পঞ্চম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এবং সপ্তম ও নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় ।

এবার আসা যাক, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ঢাকা-১১ আসনে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? কারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন?

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নির্বাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেনি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ কে এম রহমত উল্লাহ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়।
২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪ শত ৫৭ জন। এই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের এ কে এম রহমত উল্লাহ, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির শামীম আরা বেগমসহ ৮জন প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।

কিন্তু ভোটের আগের দিন রাতে প্রশাসনের যোগসাজসে ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থীর লোকজন নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখে। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ কে এম রহমত উল্লাহকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় ।

২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী,বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টিসহ বেশিরভাগ দল এই নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ ওয়াকিল উদ্দিনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা-১১ সংসদীয় আসনটি বিএনপির ঘাঁটি। এখানে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থাও বেশ মজবুত। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারি এম. এ. কাইয়ুম বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি এবং সাবেক কমিশনার। স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে পরিচিত। আওয়ালীগ সরকারের আমলে বিদেশে অবস্থানকারি কাইয়ুম তৃণমূল কর্মীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। একদিকে বিএনপির সাংগঠনিক শক্ত অবস্থান অন্যদিকে তার জনপ্রিয়তার কারণে ভোটের লড়াইয়ে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে এম.এ কাইয়ূম।

অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

জুলাই পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তিনি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে । প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম. এ. কাইয়ুমের মুখোমুখি হচ্ছেন। তার একমাত্র ভরসা জামায়াতে ইসলামীর ভোট ব্যাংক। নাহিদ ইসলাম জাতীয় নাগরিক পার্টির আহবায়ক হলেও রামপুরা-বনশ্রী ছাড়া অন্যান্য এলাকায় কিংস পার্টির তকমা পাওয়া দলটি সাংগঠনিক দিক থেকে শক্তিশালী নয়। তবু জয়ের ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড.মুহাম্মদ ইউনূসের অতি আস্থাভাজন নাহিদ ইসলাম।

এদিকে জয়ী হলে ১১ দলীয় প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে মন্ত্রী করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ইনসাফের বাংলাদেশের পক্ষে জনগণের রায় অর্জিত হলে, সেই সরকারে নাহিদ ইসলামকে একজন মন্ত্রী করা হবে। সব মিলিয়ে ঢাকা-১১ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এমনটা মনে করেন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোরের জরিপে অংশগ্রহণকারি বেশিরভাগ ভোটার।

বিএনএনিউজ/শামীমা চৌধুরী শাম্মী/এইচ.এম।

 

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ