বিএনএ, ঢাকা : কুমিল্লা-১১ সংসদীয় আসনটি কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত। এটি জাতীয় সংসদের ২৫৯ তম আসন। একটি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনটির বুক ছিড়ে চলে গেছে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক।
এই আসনে জামায়াত ইসলামী দলের নায়েবে আমির সাবেক এমপি ডা. আব্দুল্লাহ তাহেরকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপি এই আসনে প্রার্থী নির্বাচনে চমক দেখিয়েছে। তরুণ ক্লিন ইমেজে অধিকারি কুমিল্লা জেলা দক্ষিণ জেলার যুগ্ম আহবায়ক ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আহবায়ক কামরুল হুদাকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফলে এবার খুব সহজে সংসদে যেতে পারছে না ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ তাহের।
সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে জেনে নেই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত বিগত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল।
১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৯ হাজার ৩ শত ৫৯ ভোট। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ভোটার। জাতীয় পার্টির প্রার্থী কাজী জাফর আহমেদ নাঙ্গল প্রতীকে পান ৩৫ হাজার ৮শত ৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন জামায়াত ইসলামীর বর্তমান নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাহের। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ২৫ হাজার ৪ শত ১৮ ভোট। আওয়ামী লীগের মুজিবুল হক তৃতীয় হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ২৪ হাজার ৬ শত ৩ ভোট।
১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ সব বিরোধী দল এই নির্বাচন শুধু বর্জন করে ক্ষান্ত হয়নি, প্রতিহতও করে। নির্বাচনে বিএনপি, ফ্রিডম পার্টি এবং কিছু নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল, অখ্যাত ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে বিএনপির সামসুদ্দিন আহমেদকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ হওয়ার পর সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোটার ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৭ শত ৬৯ ভোট। ভোট প্রধান করেন ১ লাখ ৭ হাজার ৫২ জন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুজিবুল হক বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪৯ হাজার ৭ শত ৬৭ জন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন জামায়াত ইসলামীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাহের। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ২৫ হাজার ৯ শত ৮৪ ভোট। জাতীয় পার্টির কাজী জাফর আহমেদ তৃতীয় হন। নাঙ্গল প্রতীকে তিনি পান ২২ হাজার ৪ শত ৭৮ ভোট।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১৯ হাজার ৪ শত ২ ভোট। নির্বাচনে ভোট প্রধান করেন ১ লাখ ৬৪ হাজার ২ শত ১০ ভোট। নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোটের প্রার্থী ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাহের বিজয়ী হন। দাঁড়ি পাল্লা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৮ হাজার ৪ শত ৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন আওয়ামী লীগের মুজিবুল হক। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৫৪ হাজার ১ শত ৭২ ভোট। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন এসএম জহিরুল হক। নাঙ্গল প্রতীকে তিনি পান মাত্র ৪শত ৭৪ ভোট।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে এই আসনের সীমানা পরিবর্তন হয়। জাতীয় সংসদের ২৫৯ নম্বর এই আসনটি কুমিল্লা-১১ নামে পরিচিতি পায়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪ শত জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫ শত ৮৪ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মুজিবুল হক বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ১২ হাজার ২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন জামায়াত ইসলামীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লা তাহের। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ৭৭ হাজার ৯ শত ২৪ ভোট। জাতীয় পার্টির কাজী জাফর আহমেদ নাঙ্গল প্রতীকে পান ১২ হাজার ৯ শত ৮০ ভোট।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোঃ মুজিবুল হক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজযী হন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে র্নিবাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেনি।
২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৮ হাজার ২শত ৮০ জন। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৫ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের মোঃ মুজিবুল হক, ধানের শীষ প্রতীকে জাতীয় ঐক্যে ফ্রন্ট থেকে জামায়াত ইসলামীর ডাঃ সৈয়দ আবদুল্লাহ তাহের, গোলাপ ফুল প্রতীকে জাকের পার্টির তাজুল ইসলাম বাবুল,হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোঃ কামাল উদ্দিন ভুইয়া, কুলা প্রতীকে বিকল্পধারা বাংলাদেশ শামছুল হক জেহাদী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।
কিন্তু নির্বাচনের আগের রাতেই প্রশাসনের যোগসাজসে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নৌকা প্রতীকে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে রাখে। রাতের ভোট খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোঃ মুজিবুল হক বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৪৭.৮০ শতাংশ। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩০.৯২ শতাংশ, বিএনপি ৯.৬৯ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৩৫.৭৮ শতাংশ, জামায়াত ইসলামী ২৫.৪০ শতাংশ ভোট পান।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৬.১৮ শতাংশ। প্রদত্ত ভোটের আওয়ামী লীগ ৪৭.৪৯ শতাংশ, বিএনপি ৬.৭৮ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ২১.০০ শতাংশ,জামায়াত ইসলামী ২৪.২৭ শতাংশ ভোট পান।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৪.৮৪ শতাংশ। প্রদত্ত ভোটের মধ্য আওয়ামীলীগ ৩২.৯৯ শতাংশ, ৪ দলীয় জোট ৬৬.০২ শতাংশ ভোট পান।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮১.২৮ শতাংশ। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৫২.০১ শতাংশ ভোট ৪ দলীয় জোট ৪০.০৫ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৬.৬৭ শতাংশ ভোট পায়
১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচন থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাহের। এর মধ্য শুধু মাত্র ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে খুব সহজে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
প্রসঙ্গত, গণভোট, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, পিআর পদ্ধতির নির্বাচন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার ও বিএনপির বিরুদ্ধে প্রছন্ন হুমকি দিয়েছেন আবদুল্লাহ তাহের। তিনি বলেছেন, সোজা আঙ্গলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাঁকা করবেন। আরও এক ধাপ বাড়িয়ে বলেছেন, ‘আমাদের ঘি লাগবেই’।
ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লা তাহেরের এমন বক্তব্য এখন ভাইরাল। প্রতিহিংসাপরায়ন ও আত্ম অহংকারমূলক তার এই বক্তব্য সারাদেশের রাজনৈতিক সচেতন মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কুমিল্লা ১ নির্বাচনী এলাকাতেও।
প্রশ্ন ওঠেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১ (চৌদ্দগ্রাম) সংসদীয় আসনে এবার আঙ্গুল বাকা না করে ঘি উঠাতে অর্থাৎ বিজয়ী হতে পারবেন কি? সমালোচকরা বলছেন, জামায়াত ইসলামীর নায়েবে আমিরকে জিততে হলে জোগাড় করতে হবে ৯ মন ঘি। তবেই রাধা নাচবে। অর্থাৎ দাড়ি পাল্লার কেতন উড়বে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি এই আসনটি ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত ইসলামীর কাছে ছেড়ে দিলেও এবার এই আসনটি দখলে নিতে মরিয়া।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্লিন ইমেজ ও তারণ্যর প্রতীক বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদাকে নিয়ে নেতাকর্মীরা চাঙ্গা। এলাকার ভোটারা বেশ উজ্জীবিত। একই সঙ্গে আশাবাদী। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে জামায়াত ইসলামীর দখল,চাঁদাবাজি, মাস্তানিসহ নানা কর্মকান্ডের সমালোচনা করছেন তরুণ রাজনীতিক, শিল্পপতি মো কামরুল হুদা।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আসনটি আ’লীগের ঘাঁটি থাকলেও তা এরশাদ আমলে এই আসনটি চলে যায় জাতীয় পার্টির দখলে। যা ফিরে পেতে আওয়ামী লীগকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৯৬ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত।
২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি চলে গিয়েছিল বিএনপির সমর্থনে জামায়াত ইসলামীর ঘরে। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জামায়াত জোটকে পরাজিত করে আসনটি পুনরুদ্ধার করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এবার মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী মজিবুল হক ও শীর্ষ নেতাকর্মীরা পলাতক। যারা এলাকায় আছে তারা নিরব। তবে ভিতরে ভিতরে তারা বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় গনেশ উল্টে যেতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হলে জাতীয় সংসদের ২৫৯ তম সংসদীয় আসন (কুমিল্লা-১১) আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদার কাছে জামায়াত ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ তাহের হেরে গেলে অবাক হবার কিছু থাকবে না এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও এলাকার ভোটারা।
বিএনইনিউজ/সৈয়দ সাকিব/এইচ.এম।
![]()


