শুক্রবার (৮ মে) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পতিসর কাচারি বাড়িতে দেবেন্দ্র মঞ্চে জেলা প্রশাসনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে যখন আসতেন, তখন কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে ব্যথিত হতেন। তিনি শুধু কবি ছিলেন না, সমাজ সংস্কারকও ছিলেন। কৃষকদের সহায়তায় তিনি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন, আধুনিক কৃষি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কৃষিকে আধুনিক করার জন্য তিনি নতুন চিন্তা ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এটি ছিল তার সাহিত্যচর্চার বাইরেও মানুষের জন্য গভীর দায়বদ্ধতার প্রকাশ।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি কোনো তাত্ত্বিক নই, পণ্ডিতও নই। সাহিত্যের উপর বিশেষ পাণ্ডিত্যও নেই। কিন্তু সাহিত্যকে ভালোবাসি, রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসি, নজরুলকে ভালোবাসি। যে মানুষ সাহিত্য চর্চা করে, কবিতা পড়ে, গান শোনে কিংবা গান গায়, সে মানুষ নিঃসন্দেহে মানবিক হয়।’
নিজের পারিবারিক স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন একজন দাপুটে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি মুসলিম লীগ করতেন। প্রতিদিন সকালে হাঁটাহাঁটি শেষে ফিরে এসে রবীন্দ্রনাথের ‘শাহজাহান’ কবিতা আবৃত্তি করতেন। সেই সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়।’
রবীন্দ্রচর্চাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার সমালোচনা করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘অনেকেই রবীন্দ্রনাথকে সাম্প্রদায়িকভাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন। আমি মনে করি, এটি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও অনুভবের অভাব। রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব মানবতার কবি। তার সাহিত্য মানুষের জীবনকে সুন্দর ও আলোকিত করার শিক্ষা দেয়। আমার কাছে তিনি একজন দার্শনিক।’
সমসাময়িক রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো পরিচ্ছন্ন হয়নি। মানুষ বারবার পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছে, জীবন দিয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অনেক সময় আসেনি। আমাদের নেতা বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এই কথার মধ্যে অনেক গভীরতা আছে। কেউ ভারতের পক্ষে, কেউ পাকিস্তানের পক্ষে, কেউ আমেরিকার পক্ষে- কিন্তু আমরা বাংলাদেশের পক্ষে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নওগাঁ, নাটোরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের অনেক সহযোদ্ধা প্রাণ দিয়েছেন। জুলাইয়ের আন্দোলনে আমাদের তরুণেরা যে সংগ্রাম করেছে, আমরা সেটিকে ‘জুলাই যুদ্ধ’ বলি। মানুষ এখন নতুন প্রত্যাশা নিয়ে সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। যারা দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, তারা অর্থনীতি লুট করেছে, ব্যাংক ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, প্রশাসনকে দুর্বল করেছে। সেই অবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই আমরা আজকের অবস্থানে এসেছি।’
দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, ‘দেশে একটি হতাশাগ্রস্ত গোষ্ঠী আছে, যারা সবসময় সমাজকে অস্থির রাখতে চায়। ছোটখাটো ইস্যুকে বড় করে গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা চাই না দেশে আর কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি হোক।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল ইসলাম রেজু, নওগাঁ-৫ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুল ইসলাম ধলু, নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল, নওগাঁ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ইকরামুল বারী টিপু, নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক, সাবেক রাষ্ট্রদূত এম মুশফিকুল ফজল (আনসারী), রাজশাহী রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ শাহজাহান, নওগাঁ জেলা পরিষদের প্রশাসক আবু বক্কর সিদ্দিক, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আলোচনা সভা শেষে ঢাকা ও স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে আবৃত্তি, রবীন্দ্রসংগীত, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত পতিসরজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে দিনভর ভিড় করেন হাজারো দর্শনার্থী ও রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষ।
বিএনএনিউজ/এইচ.এম।
![]()

