বিএনএ, ঢাকা : জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময় জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন। কিন্তু নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে দলটি শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন ভাগাভাগির জোট করেছেন।
যদিও এনসিপি-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এই জোটকে আদর্শিক নয়, বরং “কৌশলগত ঐক্য” হিসেবে বর্ণনা করেছেন । তাঁর মতে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে এই বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজন ছিল।
২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডাঃ শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে, এনসিপি এবং এলডিপি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১১-দলীয় জোট গঠন করেছে।
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির এই জোটকে অনেক নেতাকর্মী “আদর্শিক বিচ্যুতি” এবং “আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত” হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর প্রতিবাদে এনসিপি থেকে অন্তত ২০ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। এই তালিকায় রয়েছেন সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক ও পলিসি কাউন্সিলের সদস্য, ডা. তাজনুভা জাবীন, যুগ্ম আহ্বায়ক এবং নীতি ও গবেষণা উইংয়ের প্রধান ডা. খালেদ সাইফুল্লাহ, যুগ্ম সদস্যসচিব ও মিডিয়া সেল সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল, আইসিটি সেল প্রধান ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা, মওলানা ভাসানীর নাতি উত্তরবঙ্গ বিষয়ক সংগঠক আজাদ খান ভাসানী, দক্ষিণবঙ্গ বিষয়ক সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, জাতীয় যুবশক্তির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী (প্রীতি)।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব এবং চট্টগ্রাম মহানগর ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক মীর আরশাদুল হক, আরেক কাঠি সরেস। তিনি পদত্যাগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। শুধু মীর আরশাদুল হক নয়-খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, ফেনী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা দলে দলে এনসিপি ত্যাগ করে বিএনপির পতাকা তলে জড়ো হচ্ছেন।।
নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, কুষ্টিয়া-৩ আসনের প্রার্থী নুসরাত তাবাসসুম, নওগাঁ-৫ এর মনিরা শারমিন এবং খাগড়াছড়ির মঞ্জিলা ঝুমা ।
তাদের অভিযোগ, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও এনসিপির মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।
এক ফেসবুক পোস্টে এনসিপি নেত্রী তাজনূভা জাবীন লিখেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বা নারী বিষয়ের কারণের চেয়েও যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী ঐক্য হয়েছে, তা ভয়ঙ্কর।
“এটাকে রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনী জোট ইত্যাদি লেভেল দেয়া হচ্ছে। আমি বলব এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে ” লিখেছেন জাবিন। তিনি আরও লিখেন “এই জিনিস হজম করে, মরতেও পারব না আমি। আমার নেতা হবে মাজাওয়ালা, জুলাই রাজনীতির ধারক। কিন্তু পুরো জুলাইকে নিয়ে রাজনৈতিক কৌশলের নাম করে তুলে দিচ্ছে জামায়াতের হাতে “।
জাবিন দাবি করেন, ধীরে ধীরে রাজনীতি করে সব অপশনকে বাদ দেওয়া হয়েছে যাতে জামায়াতের সাথে জোট করা ছাড়া কোন উপায় না থাকে। এটি পরিকল্পিত বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। জাবিন এনসিপির আদর্শিক অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কথাও তুলে ধরেছেন তার এই পোস্টে।
এদিকে নির্বাচনের ঠিক আগে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে এনসিপির জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একটি জরিপ অনুযায়ী, ভোটারদের মধ্যে এনসিপির সমর্থন মাত্র ২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে বিএনপি ৭০ শতাংশ এবং জামায়াত ১৯ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে ।
এছাড়া দলের প্রধান নাহিদ ইসলাম, শীর্ষ নেতা সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, হান্নান মাসউদ, নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীসহ অনেকের হলফনামায় প্রদর্শিত আয় এবং সম্পদের উৎস নিয়েও রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে, যা দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে, এনসিপি তার প্রতিষ্ঠাকালীন আবেদন হারিয়ে বর্তমানে একটি বড় ধরনের নেতৃত্বের শূন্যতা ও অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার নির্বাচনী জোটকে সমালোচকরা বলছেন, জামায়াতের বোতলে বন্দি হয়ে গেছে এনসিপি! অর্থাৎ এখান থেকে বেরিয়ে আসার শক্তি তাদের নেই।
প্রসঙ্গত, ইসলামের ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে, নবী সুলাইমান (আ.)-কে জ্বিনদের ওপর নিয়ন্ত্রণ করার বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছিলেন আল্লাহ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, তিনি অবাধ্য জ্বিনদের তামার তৈরি পাত্র বা বোতলে বন্দি করে সমুদ্রের গভীরে নিক্ষেপ করতেন । প্রতিটি বোতলের মুখে সুলাইমান (আ.)-এর নামাঙ্কিত একটি সিল বা মোহর থাকতো, যা ভাঙার ক্ষমতা কোনো জ্বিনের ছিল না।
এনসিপি মূলত ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে গঠিত হয়েছিল। জামায়াতের মতো পুরনো ও বিতর্কিত রাজনৈতিক শক্তির সাথে জোটবদ্ধ হওয়া এবং এনসিপি-র স্বকীয়তা হারানোর বিষয়টি জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশলে “বন্দি” হওয়া হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এনসিপি ১১ দলীয় জোটে যোগদানের শুরুতে ৫০টি আসন দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত ৩০টি আসনে সমঝোতা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, জামায়াতে ইসলামী ১০টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি নয়। তবে এই সংবাদকে গুজব বলে দাবি করেছেএনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী।
উভয় দলের দাবি ১১ দলীয় জোটের মধ্যে আসন সমঝোতা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই আসন বণ্টন চূড়ান্ত করা হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যা দলটির “রাজনৈতিক দর পতন” হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে গঠিত এই দলটি বর্তমানে সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এনসিপি মূলত নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত —দলটির বড় ধরনের রাজনৈতিক পরাজয় বা পতন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনএনিউজ/সৈয়দ সাকিব/এইচ.এম।
![]()

