কথায় বলে যত গর্জে তত বর্ষে না। অর্থাৎ এমনভাব দেখায় যেন সব কিছু খুব দ্রুত শেষ করে ফেলবে কিন্তু ফলাফল মোটেও ভাব দেখানোর সমানুপাতিক হয় না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি সাম্প্রতিক লেজে গোবরে অবস্থা তারই প্রমাণ পাওয়া যায়। দলটি গত এক বছর ধরে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধানের বিশেষ অনুকূল্য পেয়ে জনগণের কাছে পৌছাতে পারেনি। তাদের সব গর্জন মিডিয়া কেন্দ্রিক।
গত ২২ জুন নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন ফর্ম জমা দিতে গিয়েছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি কেন্দ্রীয় নেতারা। এ সময় দলটির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছিলেন, আগামী ভোটে ‘শাপলা’র জয়জয়কার হবে এবং সরকার গঠন করবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
এই নেতা আরও বলেন, সংস্কার কমিশন যে চারশ’ আসন করার প্রস্তাব করেছে, তার মধ্যে ৩০০ আসন এনসিপির ঘরে থাকবে। সব চ্যালেঞ্জ মাড়িয়ে এগিয়ে যাবে তাদের দল।
কিন্তু সাড়ে তিন মাসের মাথায় ৬ই অক্টোবর নির্বাচন কমিশনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এনসিপির মূথ্য সমন্বয়ক আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১৫০টি আসনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন“বিএনপি ৫০-১০০ আসনের বেশি যাবে না।
বিএনপি ও জামায়াতের উদ্দেশ্যে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, “আমরা দুটি দলের কর্মী-সমর্থক-নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানাব, আপনারা জাতির দিকে তাকিয়ে হলেও ভণ্ডামি বাদ দেন। নির্বাচনের মধ্যে এসে জনগণকে আপনারা মুক্তি দেন।”
গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে এনসিপি একীভূত হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “দলের নাম এনসিপি থাকবে। এনসিপির প্রতীক থাকবে। অন্য দলের নাম-মার্কা ডিজলভ হবে এবং এনসিপির আন্ডারে আরো অনেকগুলো দল আসছে। এটা আমরা বড় ধরনের একটা পার্টি করতে যাচ্ছি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির মূখ্য সমন্বয়কের দেয়া তথ্যানুযায়ি গত সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে দলটির অর্ধেকে নেমে এসেছে! নির্বাচনের এখনো ৫ মাস বাকি। যে হারে এনসিপির বিজয়ী আসনের কমছে, তার ধারা অব্যাহত থাকলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির পাশে তিন শূণ্য বসার সম্ভাবনা রয়েছে।
৬ই অক্টোবর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে এমন ঈঙ্গিত দিয়েছেন এনসিপির সমর্থক প্রবাসী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন। তিনি লিখেন “আমি তো ৫ তারিখের ছয় দিনের মাথায় বলেছিলাম, শুনছিলেন? আসল কাজ বাদ দিয়ে ধান্দাবাজিতে নেমে গিয়েছিলেন। আপনারা মনে করছিলেন নিজেরা বিশাল কিছু হয়ে গেছেন। এখন কাঁদেন কেন?”
তিনি আরও বলেন, “এনসিপি বলে এদেশে কিছু থাকবে না, সর্বোচ্চ বিকাশ পার্টির মতো কিছু একটা হতে পারবেন। জামায়াত-বিএনপির বাইরে ১০–১৫ বছর পরে আওয়ামী লীগ আসতে পারে, তবে এনসিপি না।”
ইলিয়াস হোসেন বলেন, “আপনারা কিছু টাকা কামিয়েছেন কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। ইউনুছসহ প্রতিটি উপদেষ্টা ধান্দাবাজি করেছে এবং সবাই বিদেশে টাকা পাচার করেছে।
আপনাদেরও কেউ কানাডা, কেউ তুর্কি, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ইউরোপে টাকা জমিয়েছেন। অতএব শুধু উপদেষ্টারানা না, আপনাদেরও সবাই সেইফ এক্সিটের চিন্তা করেন। সামনে আওয়ামী লীগ মারবে, বিএনপি মারবে, কথা না শুনলে জামায়াতও মারবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার একটু দুর্বলতা আছে, তাই ভালোবাসা দিয়ে বললাম, তবে ভবিষ্যৎ তোমাদের অন্ধকার।
যাদেরকে আদর করে উপদেষ্টা বানিয়েছো, তারাই এখন বেগুন, আলু, মুলা ধরিয়ে দিয়েছে। অথচ তাদের পক্ষ হয়ে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, মনে আছে?”
সবশেষে তিনি বলেন, “এখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমান। সামনে নির্বাচন হবে জামায়াত আর বিএনপির মধ্যে।”
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি চ্যানেল একাত্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তাঁরা কেউ সরকারের উপদেষ্টা পদে যেতে চাননি। তাঁরা জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেটা হলে ছাত্রদের দায়িত্ব নিতে হতো না। রাজনৈতিক শক্তি বা অভ্যুত্থানের শক্তি সরকারে না থাকলে অন্তর্বর্তী সরকার তিন মাসও টিকত না। প্রথম ছয় মাস সরকারকে উৎখাত করা বা প্রতিবিপ্লব করার নানা ধরনের চেষ্টা চলমান ছিল। এটা এখনো মাঝেমধ্যে আছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের নেতাদের এবং যাঁরা উপদেষ্টা হয়েছেন, তাঁদের অনেককে বিশ্বাস করাটা আমাদের অবশ্যই ভুল হয়েছিল। আমাদের উচিত ছিল ছাত্র নেতৃত্বকেই শক্তিশালী করা, সরকারে গেলে সম্মিলিতভাবে যাওয়া। নাগরিক সমাজ বা রাজনৈতিক দলকে আমরা যে বিশ্বাসটা করেছিলাম, যে আস্থা রেখেছিলাম, সেই জায়গায় আসলে আমরা প্রতারিত হয়েছি।
এনসিপির আহবায়ক আরও অনেক উপদেষ্টা নিজেদের আখের গুছিয়েছে অথবা গণ–অভ্যুত্থানের সঙ্গে বিট্রে করেছে। যখন সময় আসবে, তখন আমরা এদের নামও উন্মুক্ত করব।’
সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম আরও বলেছেন, ‘উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে লিয়াজোঁ করে ফেলেছে। তারা নিজেদের সেফ এক্সিটের কথা ভাবতেছে। এটা আমাদের অনেক পোহাতে হচ্ছে এবং পোহাতে হবে। কিন্তু তারা যদি এটা বিশ্বাস করত যে তাদের নিয়োগকর্তা ছিল গণ–অভ্যুত্থানের শক্তি, রাজপথে নেমে জীবন দেওয়া ও আহত সাধারণ মানুষজন এবং তারা যদি তাদের ওপর ভরসা করত, তাহলে উপদেষ্টাদের এই বিচ্যুতি হতো না।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক দফা ঘোষণা করেছিলেন সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি উপদেষ্টা হয়েছিলেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হয়েছিলেন তিনি। গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার থেকে পদত্যাগ করে এনসিপির আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন নাহিদ। অবশ্য ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারে যোগ দেওয়া মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এখনো উপদেষ্টা রয়েছেন।
সৈয়দ সাকিব
![]()

