বিএনএ ডেস্ক: রাজনীতি, বিপুল অর্থবিত্ত, ব্যাংকিং সাম্রাজ্য আর একের পর এক হাই-প্রোফাইল বিতর্ক—এসব নিয়েই ছিলেন চট্টগ্রামের একচ্ছত্র রাজনৈতিক অধিপতি আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে, তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘ ১৪ বছর পর এমন এক গোপন নথি সামনে এসেছে, যা পুরো দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে এক বিশাল ঝড় তুলেছে। জীবদ্দশায় তিনি নাকি বিয়ে করেছিলেন এক জাপানি নারীকে! তাঁদের সংসারে রয়েছে নীনা আর মারিনা নামের দুই কন্যা। আজ আমরা জানবো কীভাবে একজন ছাত্রলীগ নেতা থেকে তিনি হয়ে উঠলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, প্রভাবশালী সংসদ সদস্য। কীভাবে জড়ালেন লায়ন হুমায়ুন জহির হত্যা মামলায়, এবং কীভাবে তৎকালীন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা অলি আহমেদের সাহায্যে দেশ ছাড়লেন!
১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে তিনি আনোয়ারা-পটিয়া আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিলেন এই নেতা। কিন্তু কেবল রাজনীতি নয়, বাবুর চোখ ছিল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের দিকেও। ১৯৮৩ সালে তিনি অন্যান্য উদ্যোক্তাদের সাথে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন দেশের অন্যতম প্রথম বেসরকারি ব্যাংক—ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক সংক্ষেপে UCB। রাজনীতি ও টাকার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণে বাবু তখন চট্টগ্রামের মুকুটহীন সম্রাট।
নব্বইয়ের দশকে এসে আখতারুজ্জামান বাবুর ক্ষমতার চূড়ায় ধাক্কা লাগে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৎকালীন আরেক পরিচালক বিশিষ্ট শিল্পপতি হুমায়ুন জহিরের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। ১৯৯৩ সালের ৮ই এপ্রিল ঢাকার ধানমন্ডিতে নিজ বাসভবনের সামনে আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন হুমায়ুন জহির। এই হাই-প্রোফাইল হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে নাম আসে খোদ আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর। হঠাৎ করেই বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শীর্ষ ব্যবসায়ী থেকে তিনি পরিণত হন একজন ফেরারি আসামিতে। পুলিশ তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তখন দেশে বিএনপি সরকার। কিন্তু ক্ষমতার পর্দার আড়ালে সমীকরণ বদলে যায়। ঘোর বিপদের দিনে রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে বাবুর সহায়তায় এগিয়ে আসেন তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদ। তাঁরই সহযোগিতায় আখতারুজ্জামান বাবু বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে ছদ্মনামে কলকাতার টিকিট, আর কলকাতা থেকে সরাসরি চলে যান লন্ডনে। রাজনৈতিক চিরশত্রুর হাত ধরে দেশ ছাড়ার এই ঘটনা যেন কোনো হলিউড থ্রিলারের চেয়ে কম নয়!
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশে ফেরেন, আইনি লড়াই করেন এবং হুমায়ুন জহির হত্যা মামলা থেকে খালাস পান। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজামের কাছে পরাজিত হলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
হুমায়ুন জহির হত্যা মামলার আসামি হয়ে ১৯৯৩ সাল থেকে দেশান্তরী বাবু তখন লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। আর ঠিক এই সময়েই তাঁর জীবনে আসেন জাপানি নাগরিক মিনাকো কাওয়ারাজাকি। সম্প্রতি ‘ডেইলী ওয়াদা’ পত্রিকার এক বিস্ফোরক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাঁদের বিয়ের অকাট্য প্রমাণ সামনে এসেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের ২১শে আগস্ট যুক্তরাজ্যের লন্ডনে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু মিনাকো কাওয়ারাজাকিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। কিন্তু এই বিয়ের তারিখের পেছনেই লুকিয়ে আছে এক চরম বিতর্কিত টুইস্ট!
বিয়ের ঠিক চার মাস পর, অর্থাৎ ১৯৯২ সালের ১৯শে ডিসেম্বর লন্ডনে জন্ম নেন তাঁদের প্রথম কন্যা নীনা কাওয়ারাজাকি! সময়ের এই হিসাব মেলালে যে কেউ চমকে উঠবেন। প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশে প্রথম স্ত্রী ও পরিবার থাকা সত্ত্বেও আখতারুজ্জামান বাবু কি তবে বিয়ের আগেই এই জাপানি নারীর সাথে গভীর পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন? সন্তান সম্ভবা হয়ে পড়ার কারণেই কি তিনি পরবর্তীতে লন্ডনে গিয়ে মিনাকোকে তড়িঘড়ি করে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন?
বাংলাদেশের চেনা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বাবু এই জাপানি পরিবারের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিলেন। কিন্তু তার পরিবারের সদস্যরা এই বিয়ের বিষয়টি জানতেন! তার সন্তান সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের সঙ্গে আখতারুজ্জান চৌধুরী বাবুর মনোমালিন্য হয়। বাবু পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ট অনেক আওয়ামী লীগ নেতারা বিষয়টি জানতেন। রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এই কারণে কেউ বিষয়টি প্রকাশ্যে বলার সাহস দেখায়নি।
কিন্তু সত্য কখনো চাপা থাকে না। আখতারুজ্জামান চৌধুরীর মৃত্যুর দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০২৬ সালে ইউসিবি ব্যাংকে থাকা কন্যা নীনা কাওয়ারাজাকির একটি বিশাল অঙ্কের স্থায়ী আমানত ভাঙানোর আবেদনকে কেন্দ্র করে এই গোপন অধ্যায়টি জনসমক্ষে আসে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, নিজের মৃত্যুর মাত্র ৯ মাস আগে, বাবু তাঁর এবং তাঁর জাপানি বড় মেয়ে নীনা কাওয়ারাজাকির যৌথ নামে ১ কোটি টাকার একটি স্থায়ী আমানত বা এফডিআর খুলেছিলেন। আর ২০২৬ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর সেই নীনা কাওয়ারাজাকি যখন ইউসিবি ব্যাংকের গুলশান শাখায় এই এফডিআর ভাঙানোর জন্য আবেদন করেন, তখনই ব্যাংকের নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হয় এই ধামাকা।
২০১২ সালের ৪ঠা নভেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই রহস্যময় পুরুষ। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক বিশাল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং—এক নতুন পারিবারিক রহস্য। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর এই বর্ণাঢ্য ও সিনেমাটিক জীবনকে আপনি কীভাবে দেখেন? কমেন্ট করে জানান। প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে লাইক ও শেয়ার করুন। এমন অন্তরালের খবর পেতে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।
বিএনএ/ শাম্মী
![]()

