বিএনএ : ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় ইরানি আয়োজকরা আগত প্রতিটি দেশের প্রতিনিধি দলের জন্য আলাদা আলাদা কুরআনের আয়াত তিলাওয়াতের ব্যবস্থা করেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বরাজনীতিতে ঐসব দেশের সাম্প্রতিক ভূমিকা ও অবস্থান বিবেচনা করে অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও কৌশলগতভাবে এই আয়াতগুলো নির্বাচন করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘কুরআনিক কূটনীতি’ বা ‘জানাজা কূটনীতি’ হিসেবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কোন দেশকে কী বার্তা দেওয়া হয়েছে, এই প্রতিবেদনে তার একটি চুলচেরা বিশ্লেষণ দেওয়া হলো-
সবচেয়ে বেশি শোরগোল ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সৌদি আরব প্রতিনিধি দলের সামনে তিলাওয়াত করা আয়াতটি। সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন, তখন সূরা আল-ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়।
এই আয়াতে ইসলামের প্রথম যুদ্ধ ‘বদর যুদ্ধের’ বিবরণ রয়েছে, যেখানে একটি ছোট ও দুর্বল মুসলিম দল আল্লাহর ইচ্ছায় একটি বিশাল কাফের বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। আয়াতে বলা হয়েছে—এক দল আল্লাহর পথে লড়ছিল, অন্য দল ছিল অবিশ্বাসী (কাফের)।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে ইরান নিজেদের “আল্লাহর দল” এবং আমেরিকা-ইসরায়েলকে “কাফের দল” হিসেবে ইঙ্গিত করেছে। একই সাথে আমেরিকার মিত্র সৌদি আরবকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বাহ্যিক সামরিক শক্তি যাই হোক না কেন, চূড়ান্ত বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। এটিকে সৌদি আরবের প্রতি একটি বড় পরোক্ষ খোঁচা বা মনস্তাত্ত্বিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর জন্য যুদ্ধ, শাহাদাত এবং অবিচল থাকার আয়াতগুলো বেছে নেওয়া হয়েছিল।
লেবাননের হিজবুল্লাহ এর জন্য সূরা আল-ইমরানের আয়াত শোনানো হয়: “তোমরা হতাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও।” অর্থাৎ, সাম্প্রতিক যুদ্ধে হিজবুল্লাহর সামরিক ক্ষয়ক্ষতিকে সাময়িক এবং এটি যে একটি ঐশ্বরিক পরীক্ষার অংশ, সেই সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে।
হিজবুল্লাহকে যখন বীরত্বের সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছিল, ঠিক তখন লেবাননের অফিশিয়াল সরকারি প্রতিনিধি দলের সামনে সূরা আন-নিসার ৬৬ নম্বর আয়াত পড়া হয়। এই আয়াতে বলা হয়েছে—যদি তাদের নিজেদের উৎসর্গ করতে বা ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো, তবে খুব কম লোকই তা পালন করত। এর মাধ্যমে ইরান লেবানন সরকারকে সুক্ষ্মভাবে তিরস্কার করেছে যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে লেবানন সরকার যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করেনি বা কাপুরুষতা দেখিয়েছে।
ফিলিস্তিনের হামাসের জন্য সূরা আল-আহজাবের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে—কিছু মুমিন আল্লাহর সাথে করা ওয়াদা পূরণ করেছে (শহীদ হয়েছে), আর কিছু অপেক্ষা করছে। এটি ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি সরাসরি সম্মান প্রদর্শন।
ইয়েমেনের হুতির জন্য সূরা আল-ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াত পড়া হয়, যেখানে বলা হয়েছে—তারা অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে দয়ালু। এর মাধ্যমে হুতিদের কঠোর শৃঙ্খলার প্রশংসা করা হয়েছে।
আফগানিস্তানের তালেবান প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে সূরা আল-ফাতহের প্রথম আয়াত তিলাওয়াত করা হয়: “নিশ্চয়ই আমি তোমাকে এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।”
এই আয়াতটি ঐতিহাসিকভাবে হুদাইবিয়ার সন্ধির সাথে সম্পর্কিত হলেও, এখানে তালেবানদের সামনে পড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল—আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত করার ঐতিহাসিক বিজয়কে স্বীকৃতি দেওয়া। ইরান বোঝাতে চেয়েছে, যেভাবে আফগানরা জিতেছে, ঠিক একইভাবে ফিলিস্তিন বা ইরানও পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে জয়ী হবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধানের উপস্থিতিতে সূরা আল-ইসরার ৮০ নম্বর আয়াত পড়া হয়: “হে আমার পালনকর্তা! আমাকে সত্যের সাথে প্রবেশ করাও এবং সত্যের সাথে বের করো…” এটি একটি সম্পূর্ণ ইতিবাচক এবং আধ্যাত্মিক সমর্থনের দোয়া, যা পাকিস্তানের সাথে ইরানের গভীর ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
ভারতের জন্য হিজবুল্লাহর মতো “তোমরা হতাশ হয়ো না” আয়াতটি পড়া হলেও, শাহাদাত বা পুরস্কারের অংশটুকু বাদ দিয়ে পড়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের সাম্প্রতিক কিছু আঞ্চলিক নীতির প্রতি ইরানের এক ধরণের মৃদু অসন্তোষ বা দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল।
অমুসলিম পরাশক্তি রাশিয়া ও চীনের জন্য কোনো যুদ্ধ বা উগ্র মতাদর্শিক আয়াত পড়া হয়নি।
রাশিয়ার জন্য সূরা আল-কাসাসের ৮৩ নম্বর আয়াত পড়া হয়, যেখানে বলা হয়েছে—পরকালের চিরস্থায়ী বাসস্থান তাদের জন্য, যারা পৃথিবীতে অহংকার বা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না।
চীনের জন্য সূরা আল-ইমরানের আয়াত পড়া হয়: “আল্লাহ এটিকে কেবল তোমাদের জন্য সুসংবাদ ও হৃদয়ের প্রশান্তির মাধ্যম করেছেন।” এই আয়াতগুলো অত্যন্ত শান্ত ও আশ্বস্তকর। এর মাধ্যমে ইরান বুঝিয়েছে যে, রাশিয়া ও চীন তাদের মতাদর্শিক বা ধর্মীয় মিত্র নয়, তবে তারা বিশ্বমঞ্চে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার।
ইরান এই জানাজাকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় শোকের অনুষ্ঠান হিসেবে রাখেনি, বরং এটিকে একটি ‘রাজনৈতিক থিয়েটার’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। পবিত্র কুরআনের ভাষাকে ঢাল বানিয়ে ইরান বিশ্বকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে—কারা তাদের জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসার মিত্র, কারা কেবল ব্যবসায়িক অংশীদার, আর কারা মুসলিম হয়েও শত্রুর সাথে আপস করা পক্ষ। সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়েও, পবিত্র কুরআনের আয়াত দিয়ে এমন নিখুঁত ও তীক্ষ্ণ কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সত্যিই নজিরবিহীন
দর্শক, খামেনির এই শেষ বিদায় এবং কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে দেওয়া কূটনৈতিক বার্তা সম্পর্কে আপনার মতামত কী? কমেন্ট করে আমাদের জানান। ভিডিওটি ভালো লাগলে লাইক ও শেয়ার করুন এবং চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে আমাদের সাথেই থাকুন।
বিএনএ/ শামীমা চৌধুরী শাম্মী/এইচ.এম।
![]()


