বিএনএ ডেস্ক: ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই। দেশ যখন কোটা সংস্কার আন্দোলনে উত্তাল, ঠিক তখন লাইভ টকশোতে কোটি মানুষের সামনে টেবিল চাপড়ে এই কথাগুলো বলেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আখতারুজ্জামান। আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘শতভাগ রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দেওয়া এই মানুষটিই আজ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম বড় ‘হিরো’। যে জামায়াতের নাম তিনি গালি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, ক্ষমতার সমীকরণে আজ তিনি নিজেই সেই জামায়াতের শিবিরে! রাজনীতির ইতিহাসে এমন অবিশ্বাস্য, নজিরবিহীন এবং চরম সুবিধাবাদী ডিগবাজি খুব কমই দেখা গেছে। আজকের ভিডিওতে আমরা উন্মোচন করব কীভাবে টকশোর সেই অহংকারী কণ্ঠস্বর আজ জামায়াতের কোলে ঠাঁই পেল।
ঘটনার গভীরে যাওয়া যাক। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক শুরুর দিনগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘Face the People’-এর লাইভে বসেছিলেন মেজর আখতারুজ্জামান। আলোচনা চলাকালীন তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ওপর চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
তিনি যখন আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘জঙ্গি’ বলে আখ্যায়িত করেন, তখন স্টুডিওতে উপস্থিত অপর আলোচক—যিনি পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হন—সেই রাশেদ খাঁন এবং সঞ্চালক সাগর তাকে থামানোর চেষ্টা করেন। তারা প্রশ্ন করেন, “আপনি এত বড় আন্দোলনের সবাইকে রাজাকারের সন্তান বলছেন কীভাবে?”
কিন্তু মেজর আখতারুজ্জামান বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে নিজের দাবিতে অনড় থাকেন। তার এই উগ্র বক্তব্য তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারকে ছাত্রদের ওপর নির্মম বলপ্রয়োগ ও দমনপীড়ন চালানোর একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার বা বৈধতা দিয়েছিল। সাধারণ ছাত্র-জনতার মনে এই বক্তব্য গভীর ক্ষত তৈরি করে।
টকশোতে ছাত্রদের গালি দেওয়ার ঠিক আগেই, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের সেই বহুল আলোচিত ‘আমি আর ডামি’র দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর বর্জনের মুখে আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখানোর জন্য ‘ডামি প্রার্থী’ খুঁজছিল, তখন মেজর আখতারুজ্জামান কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে দাঁড়ান।
তিনি ভেবেছিলেন আওয়ামী লীগের সেট-আপ করা আমি-ডামির এই নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়ে যাবেন। কিন্তু নির্বাচনে তার শুধু শোচনীয় পরাজয়ই হয়নি, বরং প্রয়োজনীয় ভোট না পাওয়ায় তার নির্বাচনী জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল!
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মেজর আখতারুজ্জামান নিজেকে বাঁচানোর জন্য নতুন পথ খুঁজতে থাকেন। আর এই নতুন সমীকরণের অংশ হিসেবেই ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর সবাইকে চমকে দিয়ে মেজর আখতারুজ্জামান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন।
যে দলটিকে তিনি ১৫ জুলাইয়ের টকশোতে গালি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যে আন্দোলনকারীদের তিনি ‘জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী’ বলে তীব্র ভর্ৎসনা করেছিলেন—রাজনৈতিক স্বার্থে তিনি সেই জামায়াতে ইসলামীরই প্রাথমিক সহযোগী সদস্য পদ গ্রহণ করেন। ক্ষমতার লোভে নিজের অতীত বক্তব্য ভুলে তার এই যোগদান রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
জামায়াতে যোগদানের পর তার উগ্র মেজাজ কিন্তু অপরিবর্তিতই ছিল। ২০২৬ সালের ২রা অক্টোবর মদিনা থেকে ওমরা শেষে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন জামায়াত ইসলামীর একটি বিশাল দল। কিন্তু সময় মত লাগেজ ও ট্রলি না পাওয়াকে কেন্দ্র করে তিনি বিমানবন্দরে দায়িত্বরত এভিয়েশন নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে অত্যন্ত উশৃঙ্খল ও অহংকারী আচরণ করেন। এক পর্যায়ে তিনি কর্তব্যরত একজন নিরাপত্তা রক্ষীকে শারীরিকভাবে আঘাত ও মারধর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমান বন্দরের নির্বাহী পরিচালক ঘটনা স্থলে ছুটে আসেন। আখতারুজ্জান তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন।
একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার এমন উশৃঙ্খল আচরণে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেয়। সরকারি কর্মচারীকে মারধর ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপরাধে বিমানবন্দর থানা পুলিশ একদিন তাকে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেফতার করে। আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। দীর্ঘ ৩২ দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকার পর, অবশেষে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে তিনি কারামুক্ত হন।
জামায়াত নেতা হিসেবে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর দলটির পক্ষ থেকে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। আর তার এই কারামুক্তির পর জামায়াতের রাজকীয় সংবর্ধনা দেখে ২০২৪-এর আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন ফেসবুকে একটি বিস্ফোরক পোস্ট দেন।
তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ ও বিস্ফোরক পোস্ট দিয়ে রাজনীতির এই নোংরা সমীকরণকে উলঙ্গ করে দেন। রাশেদ খাঁন তার ফেসবুক পোস্টে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন:
“যে ব্যক্তি ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই লাইভ টকশোতে দাঁড়িয়ে কোটি তরুণ, ছাত্র ও আন্দোলনকারীদের শতভাগ রাজাকারের বাচ্চা বলে গালি দিয়েছিল, আজ ক্ষমতার লোভে সে নিজেই জামায়াতের কোলে দোল খাচ্ছে। রাজনীতির কী অদ্ভুত পরিহাস! ২৪-এর সেই নব্য রাজাকারকে আজ ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছে ৭১-এর আসল রাজাকার!”
পোস্টে তিনি আরও যোগ করেন: “আন্দোলনকারীদের জামায়াত-শিবির বলে গালি দেওয়া এই সুবিধাবাদী সাবেক মেজরকে যখন জামায়াত, নিজেদের ‘হিরো’ বানিয়ে সংবর্ধনা দেয় এবং বুকে টেনে নেয়, তখন প্রমাণ হয় এদের কাছে কোনো আদর্শ নেই, দেশপ্রেম নেই—আছে শুধু ক্ষমতার নোংরা লোভ।”
রাশেদ খাঁনের এই ধারালো মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, ২০২৪-এর নির্বাচনে স্বতন্ত্র বা ডামি প্রার্থী হয়ে জামানত হারানো এবং ২০২৬-এর নির্বাচনে জামায়াতের টিকিটে দাঁড়িয়ে, বিএনপির প্রার্থীর কাছে বিপুল ব্যবধানে ধরাশায়ী হওয়া মেজর আখতারুজ্জামান আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম এক চরম সুবিধাবাদের নিকৃষ্ট উদাহরণ।
মুখের ভাষা আর আদর্শের এই চরম বৈপরীত্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখন তীব্র ঘৃণা। ছাত্রদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দেওয়া আখতারুজ্জামানের এই পরিণতি ও জামায়াতের এই সংবর্ধনাকে আপনারা কীভাবে দেখছেন? আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জানাবেন। প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে লাইক দিন, এবং শেয়ার করুন। এমন বিশ্লেষণমূলক সংবাদ সবার আগে পেতে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।
বিএনএ নিউজ /সৈয়দ সাকিব
![]()

