31.9 C
আবহাওয়া
৬:৫৬ অপরাহ্ণ - আগস্ট ৩, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » ওয়াশিংটন-দিল্লির গ্র্যান্ড ডিল! শেখ হাসিনার ফেরা চুড়ান্ত!

ওয়াশিংটন-দিল্লির গ্র্যান্ড ডিল! শেখ হাসিনার ফেরা চুড়ান্ত!


বিএনএ, ঢাকা: ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যে দলটির কার্যক্রম স্থগিত, নির্বাচন পরবর্তী বিএনপি সরকার যাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে অধ্যাদেশ জারি করেছে, সেই আওয়ামী লীগের ডানা ভাঙা রাজনীতিতে পর্দার আড়ালে হুট করেই কি কোনো অলৌকিক সঞ্জীবনী শক্তি কাজ করছে? দলের শীর্ষ নেতারা যখন কারাগারে বা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তখন এক সময়ের ডাকসাইটে থাকা নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী কীভাবে হয়ে উঠলেন আওয়ামী লীগের প্রধান ত্রাণকর্তা ও কাণ্ডারি? একের পর এক বিদেশি রাষ্ট্রদূত কেন তাঁর গুলশানের বাসভবনে কিংবা বিলাসবহুল হোটেলের রুদ্ধদ্বার কক্ষে এসে বৈঠক করছেন? গোয়েন্দা নজরদারি ফাঁকি দিয়ে হোটেল রেডিসনের গোপন বৈঠক আর নর্ডিক কূটনীতিকদের ছদ্মবেশী তৎপরতা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে এখন তোলপাড়!

যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ‘ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’ থেকে অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ে যৌথ স্নাতক  ডিগ্রি এবং  ল’ সোসাইটি ফাইনালস সম্পন্ন করা সাবের হোসেন চৌধুরী ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন।  তার আসার পিছনে রয়েছে সাবেক সেনাপ্রধান  লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম (বীর বিক্রম) এর উৎসাহ। নিরেট শখের বসে রাজনীতিতে  আসা তরুণ ও সুশিক্ষিত নেতা হিসেবে তিনি দ্রুত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার গুডবুকে চলে আসেন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল মেয়াদে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দলের নীতি নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ (বর্তমানে ঢাকা-৯ ) আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য  নির্বাচিত হন।

পারিবারিক  আভিজাত্য, আর্ন্তজাতিক ও গভীর সামরিক-রাজনৈতিক নেটওয়ার্কই সাবের হোসেনকে ক্ষমতা ও কূটনীতির এক অপরাজেয় খেলোয়াড় বানিয়ে তুলেছে।

কিন্তু ১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদে শেখ হাসিনার ছায়াসঙ্গী ও পলিটিক্যাল সেক্রেটারি হওয়া এই নেতা ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত এক-এগারোর  পটপরিবর্তনে এক চরম ধাক্কা খান। আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থী বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে ২০০৮ সালে দল বিপুল ভোটে ক্ষমতায় ফিরলেও সাবের হোসেন চৌধুরী মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। দলের মূল ধারার নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা লাইমলাইট থেকে তাকে দীর্ঘ সময় দূরে রাখা হয়।  দেশে দলের রাজনীতিতে  কোণঠাসা হলেও তিনি চোখ রাখেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে।

২০১৪ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে সংসদ সদস্যদের শীর্ষ সংগঠন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন বা আইপিইউ -এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তাক লাগিয়ে দেন  সাবের হোসেন চৌধুরী। আজ এই আইপিইউ-এর আজীবন সম্মানিত প্রেসিডেন্ট পদটিই বিশ্ব দরবারে তাঁর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ঢাল।

এই আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির কারণেই ২০২৪ সালে আগস্ট পরবর্তী দেশের চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও হত্যা ও হত্যা প্রচেস্টা মামলায় রাজনীতির ম্যাজিকম্যান খ্যাত সাবের হোসেন  গ্রেপ্তার হলেও একদিনের জন্যও তাকে জেল খাটতে হয়নি, বরং পশ্চিমা বিশ্বের কাছে তিনিই এখন আওয়ামী লীগের একমাত্র গ্রহণযোগ্য মুখ।  যার প্রমাণ মেলে গত বছরের ৬ অক্টোবর। সেদিন পড়ন্ত দুপুরে গুলশান-২ এ সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসভবনে এক নজিরবিহীন ও গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

কোনো অফিশিয়াল পতাকা বা গাড়ির কূটনৈতিক চিহ্ন ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ সাধারণ ছদ্মবেশে একসাথে সেখানে হাজির হন নর্ডিক তিন দেশের রাষ্ট্রদূত—নরওয়ের হ্যাকন আরাল্ড গুলব্রানসেন, সুইডেনের নিকোলাস লিনাস রাগনার উইকস এবং ডেনমার্কের ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মলার। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা এই বৈঠক শেষে গোয়েন্দাদের নজর এড়াতে তাঁরা ফেরার সময় ব্যবহার করেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিকল্প পথ। এর আগে ১১ মে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনের সঙ্গেও সাবের হোসেন চৌধুরীর এমনই এক অনানুষ্ঠানিক ও গোপন বৈঠক সম্পন্ন হয়েছিল।

তবে সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক নাটকটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত বিশ্বস্ত বন্ধু এবং ভারতে নিযুক্ত বিশেষ দূত সার্জিও গোর সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে দেখা করেন সাবের হোসেন চৌধুরীর সাথে। কিন্তু এই বৈঠকের পেছনের গল্প কোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম নয়! দেশের গোয়েন্দা সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে সাবের হোসেন চৌধুরী বৈঠকের ঠিক একদিন আগেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ঢাকার পাঁচতারা হোটেল রেডিসনে গিয়ে অবস্থান নেন। বৈঠক শেষ হওয়ার পরও তিনি হোটেল ছাড়েননি, সেখানেই রাত্রিযাপন করেন। আর এই অতি গোপনীয় বৈঠকের মূল এজেন্ডা কী ছিল?

কেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রভাবশালী  সার্জিও গোর পররাস্ট্রমন্ত্রী খুলিলুর রহমানের নৈশ ভোজে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকেন? তারও প্রকাশ করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবুল হাসনাত মিল্টন। তার দাবি নৈশ ভোজে ২৮২ জন আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন। ওই তালিকায় ড. ইউনূস, অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্ঠা এবং উগ্রবাদী সংগঠনের অনেকের নাম থাকায় ক্ষিপ্ত হন সার্জিও গোর। ফলশ্রুতিতে বহু প্রত্যাশিত নৈশ ভোজ বাতিল করেন তিনি।

সার্জিও গোর ও সাবের হোসেন চৌধুরীর এই বৈঠক নিয়ে কেন কঠোর গোপনীয়তা? সূত্রের দাবি— বৈঠকের মুল উদ্দেশ্য  দিল্লিতে অবস্থানরত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে ফিরে আসার পরবর্তী পরিস্থিতি, দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, তার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা!

এই মহাপরিকল্পনার রেশ ঢাকা ছাড়িয়ে আছড়ে পড়েছে দিল্লিতেও। সার্জিও গোর বাংলাদেশ সফর শেষ করে ভারতে ফিরে যাওয়ার পরদিনই নড়েচড়ে বসে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ট্রাম্পের দূতের ঢাকা থেকে ফেরার পরমুহূর্তেই বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার ত্রিবেদী-কে জরুরি ভিত্তিতে ডেকে পাঠায় দিল্লির ‘সাউথ ব্লক’। পর্দার অন্তরালে ওয়াশিংটন এবং দিল্লি কি তবে বাংলাদেশের বর্তমান বিএনপি সরকারের ওপর কোনো বড় ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির ছক কষছে? ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখতে আওয়ামী লীগকে মাইনাস না করে পুনর্বাসনের কোনো ফর্মুলা কি তৈরি হচ্ছে পর্দার আড়ালে?  এর মধ্যে  শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছে, আগামী ৫ই আগস্ট সন্ধ্যায়  নয়া দিল্লীতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসবেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট তার সরকারের পতন, তার দেশ ত্যাগ এবং দেশে ফিরে আসার প্রস্তাবিত সময়সূচি নিয়ে খোলামেলা আলাপ করবেন।

প্রসঙ্গত, মানবতা বিরোধী অপরাধে ফাসির দন্ড মাথায় নিয়ে ভারতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনাকে প্রথমবারের মতো  কোনো অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল মাধ্যমে দেখা যাবে।

তবে আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতা ও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি মোটেও সহজভাবে নিচ্ছে না ত্রয়োদশ নির্বাচন পরবর্তী গঠিত বিএনপি সরকার। সরকারের ভেতরে এই নিয়ে চরম উত্তেজনা ও অস্বস্থি রয়েছে। আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করার ইঙ্গিত দিচ্ছে প্রশাসন।  শেখ হাসিনা দেশে পা রাখামাত্রই আদালতের রায় অনুযায়ী তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে সরকার বদ্ধপরিকর। একই সাথে সাবের হোসেন চৌধুরীর এই ‘আন্তর্জাতিক কার্ড’ ব্যবহারের ওপরও রয়েছে কড়া গোয়েন্দা নজরদারি।

সাবের হোসেন চৌধুরীর এই কূটনৈতিক চাল আর ট্রাম্পের দূতের গোপন মিশন কি আসলেই শেখ হাসিনাকে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেবে? পর্দার আড়ালের এই কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহাসমর বাংলাদেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে?  ওয়াশিংটন-দিল্লির গ্র্যান্ড ডিল  চাপে কি বিএনপি সরকার সুর নরম করবে? নাকি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো ঝড় আনবে?

 

গবেষণা ও গ্রন্থনা : ইয়াসীন হীরা 

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ