34 C
আবহাওয়া
৬:৪৪ অপরাহ্ণ - জুন ১, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » ১ কোটি ৮৭ লাখে ‘না’ ২ কোটি ৩০ লাখে ‘হ্যাঁ’!

১ কোটি ৮৭ লাখে ‘না’ ২ কোটি ৩০ লাখে ‘হ্যাঁ’!


বিএনএ, ডেস্ক : ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় যে কাজ ‘অতিরিক্ত দর’ হিসেবে বাতিল হয়ে যায়, সেই একই কাজ  কিছু দিনের ব্যবধানে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকায় অনুমোদন পায়—এমন অবিশ্বাস্য ‘ম্যাজিক’ কেবল আমাদের দেশের সরকারি সার কারখানাতেই সম্ভব! দেশের অন্যতম বৃহৎ সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)-এ ব্যাগিং, স্ট্যাকিং ও ক্লিনিংসহ আনুষাঙ্গিক কাজের ঠিকাদার নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান এবং তার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকা হরিলুটের ভয়ঙ্কর সব অভিযোগ। আজ আমরা অনুসন্ধান করে দেখবো, কীভাবে সিইউএফএল-এর সৎ কর্মকর্তাদের ক্ষোভকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিনে-দুপুরে চলছে এই টেন্ডার কেলেঙ্কারী এবং কারা আছেন এই হরিলুটের নেপথ্যে!

YouTube player

নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো সরকারি টেন্ডারে প্রতিযোগিতা হলে খরচ কমার কথা। কিন্তু সিইউএফএল-এ ঘটেছে ঠিক তার উল্টো! প্রথম দফার দরপত্র বাতিল করার পর, দ্বিতীয় দফায় আনোয়ার ট্রান্সপোর্ট নামের একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে আসরে নামে এমডির সিন্ডিকেট। কাজটির সিডিউল কিনেছিল ১০টি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রহস্যজনকভাবে দরপত্র জমা দিতে পেরেছে মাত্র দুটি! শাহ মোহসেন আউলিয়া এন্টারপ্রাইজ এবং এমডির আসল লক্ষ্য—আনোয়ার ট্রান্সপোর্ট। অভিযোগ উঠেছে, বাকি ৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কারখানায় ঢুকতেই দেয়নি  দুই ঠিকাদারের  পেটোয়া ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা! গেটেই আটকে দেওয়া হয়েছে তাদের, যাতে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই আনোয়ার ট্রান্সপোর্ট ৪৩ লাখ টাকা বেশি মূল্যে কাজ বাগিয়ে নিতে পারে।

দরপত্র জমার ক্ষেত্রেও মানা হয়নি নিয়ম। নিয়ম অনুযায়ী  ঢাকার দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকার  বিসিআইসি এর প্রধান কার্যালয়,  চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ আঞ্চলিক অফিস, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সিইউএফএল কার্যালয়ে টেন্ডার বাক্স থাকার কথা থাকলেও, বিশেষ উদ্দ্যেশে শুধুমাত্র আনোয়ারা  সিইউএফএল কার্যালয়ে টেন্ডার দাখিলের কথা শিডিউলে উল্লেখ করা হয়।

এমনকি সংবেদনশীল এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ পাহারার বিধান থাকলেও রহস্যজনক কারণে পুলিশ ডাকা হয়নি। ফলে এমডির মনোনীত ‘আনোয়ার ট্রান্সপোর্ট’ ও ‘শাহ মোহসেন আউলিয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর ক্যাডার বাহিনী পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অন্য ৮টি প্রতিষ্ঠানকে কারখানায় ঢুকতেই দেয়নি।

এখানে শেষ নয়- ঠিকাদার নিয়োগের শর্তাবলীতে  জুড়ে দেওয়া হয়েছে বিগত ৩০ বছরের অভিজ্ঞতার কঠিন শর্ত। প্রশ্ন উঠেছে, সারের বস্তা সেলাই, ব্যাগিং, স্ট্যাকিং ও ক্লিনিংয়ের মতো কায়িক পরিশ্রমের কাজগুলো করে থাকেন সাধারণ শ্রমিকরা। এখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ৩০ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত কেন? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া সুবিধা দিতেই এই কাল্পনিক ও অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

বিসিআইসি নিয়ন্ত্রাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ই-জিপি চালু থাকলেও সিইউএফএল-এ কেন ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টেন্ডার নেওয়া হলো, তা নিয়ে কারখানার ভেতরে-বাহিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রথম দফার ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার দরকে ‘বেশি’ বলে বাতিল করে দ্বিতীয় দফায় ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার উচ্চদর গ্রহণ করা হয়েছে।

কিন্তু কেন এই ৪৩ লাখ টাকা বেশি দিয়ে কাজ দেওয়া হলো? সিইউএফএল কারখানার ভেতরে-বাহিরে এখন জোর গুঞ্জন—এই বাড়তি দরের পেছনে রয়েছে এমডি সিন্ডিকেট ও ঠিকাদারের মধ্যকার গোপন ‘ফিফটি-ফিফটি’ বা সমান ভাগাভাগির চুক্তি। প্রায় ৮০ লাখ টাকা বাড়তি দর দেখিয়ে সরকারের এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি করা হচ্ছে, যার বড় একটি অংশ সরাসরি যাচ্ছে এমডি মিজানুর রহমান ও তার নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের পকেটে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি অর্থ লোপাটের এই মহোৎসবের মূল হোতা খোদ কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি মিজানুর রহমান। তবে তিনি একা নন, তার ইশারায় গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী এবং দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম খুঁটি হলেন উপ-মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মো: কামরুল ইসলাম খান, প্রধান রসায়নবিদ ও উৎপাদন বিভাগীয় প্রধান উত্তম চৌধুরী এবং অতিরিক্ত প্রধান রসায়নবিদ মো: জহিরুল হক। এই চার কর্মকর্তার মেলবন্ধনেই সরকারের কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থের পকেটে। এমডি মিজানুর রহমানের দাবি, বিসিআইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুয়ায়ি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে  টেন্ডার আহ্বান এবং শুধুমাত্র একস্থানে টেন্ডার বাক্স স্থাপন করা হয়েছে।

 

প্রসঙ্গত, এক সময় সিইউএফএল নিয়ন্ত্রণ করতেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এর ছোট ভাই আনিসুজ্জামান রনি। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সিইউএফএল –এর নিয়ন্ত্রণ নেয়- বিএনপির স্থানীয় এক নেতা। তার সঙ্গে জোট বেঁধেছে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান ও তার সিন্ডিকেট।

এদিকে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে না পারা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং সিইউএফএল সার কারখানার সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, যেখানে প্রথম দরপত্রকেই বেশি বলা হয়েছিল, সেখানে তার চেয়ে ৪৩ লাখ টাকা বেশি দরের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা স্পষ্ট দুর্নীতি। আর এই ঘটনায় কারখানার সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখন চরম ক্ষোভ ও তোলপাড় চলছে। তারা অবিলম্বে এই টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করে  স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত  এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান ও তার সিন্ডিকেট সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার  দাবি জানিয়েছেন। এই ব্যাপারে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে বেশ কয়েক দফা কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

সরকারি সম্পদকে এভাবে বাপের সম্পত্তি বানিয়ে লুটে খাওয়ার এই উৎসবের শেষ কোথায়? দুর্নীতি দমন কমিশন বা প্রশাসন কি পারবে এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে সিইউএফএল-কে রক্ষা করতে?

শামীমা চৌধুরী শাম্মী

Loading


শিরোনাম বিএনএ