বিএনএ, ঢাকা: ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের নবম ডিভিশনের জিওসি প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন এবং ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এখনো ধরা ছোঁয়ার রয়েছে সামরিক গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের অধীন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি)-এর তৎকালীন পরিচালক সাবেক মেজর জেনারেল এটিএম আমিন।

সেনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের পর তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে যে শারীরিক নির্যাতন করা হয়, তার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও তদারককারী ছিলেন এ টি এম আমিন। শুধু তাই নয়;—তারেক রহমানের বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলার আইনজীবী ছিলেন পঞ্চগড়-১ (পঞ্চগড় সদর, আটোয়ারী ও তেতুলিয়া) আসনের এমপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নওশাদ জমির। তারেক রহমানের সমর্থনে কোনো কথা প্রকাশ্যে না বলার জন্য তাকে তলব করে শাসিয়ে ছিলেন সামরিক প্রভাবশালী এ টি এম আমিন।
তারেক রহমান নিজেই ২০০৭ সালে আদালতে অভিযোগ করেছিলেন যে, তাকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো এবং দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হতো । এর ফলে তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গিয়েছিল।
সম্প্রতি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জানিয়েছেন যে, ডিজিএফআই সেই সময় অনেক রাজনৈতিক নেতা ও তারেক রহমানকে তুলে এনে অমানবিক নির্যাতন করেছিল।
২০০৭ সালে এটিএম আমিন ছিলেন সিটিআইবির পরিচালকের দায়িত্বে। সে সময় ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা তার ওপরে ব্যাপক মাত্রায় নির্ভর করতেন। ওই সময় তিনি সাবেক জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, সেনাপ্রধান থাকাকালে তার ডানহাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতি থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে বাদ দেয়ার মাইনাস-টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন ফখরুদ্দিন- মঈনুদ্দিন সরকার। তারই অংশ হিসেবে কিংস পার্টি গঠন এবং বড় দুই রাজনৈতিক দলের সংস্কারপন্থীদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান কুশীলবের ভূমিকায় ছিলেন এটিএম আমিন। হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশের একাংশকে দিয়ে বাংলাদেশে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি (আইডিপি) গঠনে সাবেক মেজর জেনারেল এটিএম আমিনের প্রয়াস এবং কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল লক্ষনীয়। ধর্মীয় উগ্রতা ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটার পেছনেও তাকে অনেকাংশে দায়ী মনে করা হয়।
২০০৭ সালের ২০ শে আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ছাত্র ও শিক্ষক লাঞ্ছনায় জড়িত ছিলেন এ টি এম আমিন। ওই সময় ড. আনোয়ার হোসেন ও ড. হারুন-অর-রশিদসহ চারজন শিক্ষককে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই ঘটনার তদন্তে একটি সংসদীয় উপকমিটি গঠন করা হয়। ২০১১ সালে জমা দেওয়া এই তদন্ত প্রতিবেদনে এ টি এম আমিনসহ তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই পদোন্নতি পেয়ে এটিএম আমিন আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন তিনি এ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এটিএম আমিন আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক থাকাকালে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার কয়েক মাস পরই তার অতীত কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা সরকার তাকে ২০০৯ সালের ১৭ মে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। এর সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্যপট থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যান এক সময়ের প্রতাপশালী এই সেনা কর্মকর্তা। পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত-এ চলে যান তিনি। বর্তমানে এটিএম আমিন স্বপরিবারে সেখানে অবস্থান করছেন।
প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার সময় তিনি ডিজিএফআই-এর দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি এই হামলার অন্যতম সন্দেহভাজন মাওলানা তাজউদ্দিনকে দেশত্যাগে সহায়তা করেছিলেন। শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকেও গ্রেনেড হামলা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।
২০১৮ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর রায় অনুযায়ী, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক মেজর জেনারেল এ টি এম আমিনকে ২টি ধারায় মোট ৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের পহেলা ডিসেম্বর হাইকোর্টের এক রায়ে, বিচারিক আদালতের আগের রায় বাতিল করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ, হাইকোর্টের সেই রায় বহাল রাখে, যার ফলে সব আসামী আনুষ্ঠানিকভাবে এই মামলার সকল দায় থেকে মুক্তি পান।
সৈয়দ সাকিব
![]()

