বিএনএ, ডেস্ক : মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন এক-এগারোর পটপরিবর্তনের প্রধান উদ্যোক্তা বা মূল কুশীলব। তখন তিনি ছিলেন সাভারে অবস্থিত সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি। তিনি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর-ডিজিএফআই এর সঙ্গে মিলে পুরো পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। তখন এমন আলোচনাও ছিল যে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ শুরুতে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন; যদিও তিনি পরে ওই পরিকল্পনায় যুক্ত হন।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির দিন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে বঙ্গভবনে যে সেনা কর্মকর্তারা গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীও ছিলেন। তিনি সেদিন বঙ্গভবনে সশস্ত্র অবস্থায় গিয়ে চাপ প্রয়োগ করেন। চাপের মুখে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহাম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। ইয়াজউদ্দিন আহাম্মেদ তখন একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। সেই পদ থেকেও তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল।

এক-এগারোতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর এমন ভূমিকার ক্ষেত্রে তাঁর ভায়রা ভাই সাঈদ এস্কান্দারেরও সম্মতি ছিল বলে তখন প্রচার ছিল। সাঈদ এস্কান্দার বেগম খালেদা জিয়ার ভাই। আবার যে কয়েকজনকে ডিঙিয়ে মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল, তাতেও সাঈদ এস্কান্দারের প্রভাব ছিল বলে আলোচনা রয়েছে। তাঁরা দুজন সেনাবাহিনীতে ব্যাচমেট ছিলেন।
যদিও মইন উ আহমেদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, দেশের রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচন পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক চাপের বিষয় রাষ্ট্রপতিকে বোঝাতে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে যান এবং সেই বৈঠকের পরই জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত হয়।
জরুরি অবস্থা জারির পর সেনা-সমর্থিত নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এরপর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হন। এই পদ ছিল সে সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রশাসনিক অভিযান সমন্বয়-কাঠামোর একটি। এই কমিটির অধীনে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, বিশেষ অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী পরে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন।
২০০৭ সালের এক-এগারোর সময় তিনি ছিলেন ক্ষমতার নেপথ্যের একজন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা। গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি, শীর্ষ রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার, বিশেষ কারাগার, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর নাম। পরে রাজনৈতিক সরকার এলে তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়ে। তারপর হন সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ছিলেন আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত। সেই সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত২৪শে মার্চরাতে গ্রেপ্তার করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ওমর ফারুক শুনানিতে বলেন, বিদেশে লোক পাঠানোর নামে ২৪ হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েছেন এই আসামি। তথাকথিত এক-এগারোর সরকারের সময় এই আসামিসহ অন্যরা মিলে ট্রুথ কমিশন গঠন করে ব্যবসায়ীদের ধরে এনে নির্যাতন করতেন এবং তাঁদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলে টাকা আদায় করতেন। রাজনৈতিক নেতাদেরও ধরে এনে নির্যাতন করতেন। বিশেষ করে মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! যাঁকে টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, তিনিই এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

