বিএনএ, ঢাকা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেশিদিন বাকী নেই। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এমনটা প্রতিনিয়ত জানিয়ে যাচ্ছেন অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা। বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী ইতোমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে পুরোদমে প্রচারাভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা- ১৫ আসনটি নিয়ে রাজনৈতিক সচেতন মানুষ অংক কষা শুরু করেছে। কেননা এই আসন থেকে প্রার্থী হয়েছের জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছে জাতীয়তাবাদী যুবদল,কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

কেমন হবে দুই শফিকের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে নেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি ঢাকা- ১৫ আসেনের নির্বাচনী ফলাফল।
ঢাকা-১৫ সংসদীয় আসনটি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এই আসনটি মীরপুর-কাফরুল- ভাটারা আসন নামে পরিচিত। এটি জাতীয় সংসদের ১৮৮ তম আসন।
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালের আদমশুমারীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার পর, নির্বাচন কমিশন ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে ঢাকা ১৫ আসনটি সৃষ্টি করে। তার আগে এটি সংসদীয় আসন ১৯০, ঢাকা -১১ নামে পরিচিত ছিল।
১৯৯১ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৪১ হাজার ১ শত ২৪ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৫ শত ৪৬ জন। নির্বাচনে বিএনপির হারুন রশীদ মোল্লা বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৪৯ হাজার ৮ শত ৮৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের ডক্টর কামাল হোসেন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪৭ হাজার ৭ শত ৫০ ভোট। এই আসনে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী তৃতীয় হন। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ৮ হাজার ১ হাজার ৯১ ভোট।
হারুন রশিদ মোল্লার মৃত্যুজনিত কারণে ১৯৯৩ সালের উপ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ মহসিন বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৮০হাজার ২ শত ৭৬ ভোট।তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদার। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৭৭ হাজার ৬ শত ৫১ ভোট।
১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ সব বিরোধী দল এই নির্বাচন শুধু বর্জন করে ক্ষান্ত হয়নি, প্রতিহতও করে। নির্বাচনে বিএনপি,ফ্রিডম পার্টি এবং কিছু নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল, অখ্যাত ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। এই নির্বাচনে বিএনপির এসএ খালেককে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ হওয়ার পর এই সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৫ হাজার ৬ শত ৬০ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ৭০ হাজার ৫ শত ৭ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কামাল আহমদে মজুমদার বিজয়ী হন। নৌকাসহ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ২৮ হাজার ৭ শত ৬৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির এখলাস উদ্দিন মোল্লা। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১লাখ ২ হাজার ৩ শত ৭ ভোট।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৬ লাখ ২৭ হাজার ৮ শত ৭ জন। ভোট প্রদান করেন ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯ শত ৪৪ জন। নির্বাচনে ৪ দলীয় জোটের এস এ খালেক বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯ শত ৫৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদার। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬শত ৬০ ভোট। জামায়াত এই আসনে কোন প্রার্থী দেয়নি, বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন দেয়।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের আগে ঢাকার ১৩টি আসনকে জনসংখ্যার ঘনত্বতের ভিত্তিতে ২০ আসনে ভাগ করা হয়। কাফরুল-ভাটার-মিরপুরের অংশ বিশেষ নিয়ে গঠিত হয় ঢাকা-১৫। যার সংসদীয় আসন নম্বর ১৮৮।
নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৯১ হাজার ৪ শত ৬৩ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ১৪ হাজার ২ শত ৮৪ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদার বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ২১ হাজার ৯৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির বীর প্রতীক হামিদুল্লাহ খান। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৭৬ হাজার ৬ শত ৪০ ভোট।
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে এই আসনটি বিএনপি জোট সঙ্গী হিসাবে জামায়াত ইসলামীকে ছেড়ে দিলেও ২০০৮ সালে বিএনপি দলীয় প্রার্থী দেয়। জামায়াত ইসলামী বিএনপিকে সমর্থন দেয়।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩ শত ৭৬ জন। ভোট প্রদান করেন ৩৪ হাজার ৭ শত ৫৪ জন।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে র্নিবাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেনি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদার বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৪০ হাজার ৩ শত ৮০ জন। প্রার্থী ছিলেন ১০ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদার, ধানের শীষ প্রতীকে জামায়াত ইসলামীর বর্তমান আমির ডা: মোহাম্মদ শফিকুর রহমান, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির সামসুল হক, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের হেমায়েত উল্লাহ, টেলিভিশন প্রতীকে বিএনএফএর এস.এম ইসলাম, গোলাপ ফুল প্রতীকে জাকের পার্টির আবদুল মান্নান মিয়া, কাস্তে প্রতীকে সিপিবির আহাম্মেদ সাজেদুল হক, কুলা প্রতীকে বিকল্পধারা বাংলাদেশের এইচ এম গোলাম রেজা, বাঘ প্রতীকে প্রগতিশীল গনতান্ত্রিক দল পিডিপির সামছুল আলম চৌধুরী, কাঁঠাল প্রতীকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সাইফুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।
কিন্তু ভোটের আগের দিন রাতে প্রশাসনের সহযোগীতায় বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে আওয়ামী লীগের লোকজন নৌকা প্রতীকে সিল দিয়ে ব্যালট বক্স ভর্তি করে রাখে। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদারকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত ইসলামীসহ তাদের সমমনা রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে, আওয়ামী লীগ, ১৪ দলীয় জোট, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে ভোটারদের তেমন উপস্থিতি ছিল না। এই নির্বাচনের ৭ মাসের মাথায় ছাত্র-জনতার বর্ষা আন্দোলনের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার ভেঙ্গে দেয়, আমি-ডামির সংসদ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোর এর গবেষণা টিম দৈবচয়ন পদ্ধতিতে সারাদেশে জরিপ চালায়। জরিপে অংশগ্রহণকারি বেশীরভাগ ভোটার ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের সপ্তম, ২০০১ সালের অষ্টম ও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরেপক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
তারই ভিত্তিতে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোর ঢাকা-১৫ আসনে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও নবম এই ৪টি নির্বাচনের প্রদত্ত ভোটের পরিসংখ্যানকে মানদন্ড ধরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত ইসলামীর সাংগঠনিক শক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি কল্পানুমান উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৪৮.৩৩% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪০.৯৭%, বিএনপি ৫২.১০%, জাতীয় পার্টি ৫.৫৮%, জামায়াত ইসলামী ৭.০৩% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১০.৬৫% ভোট পায়।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৬.৬৮% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৭.৬০%, বিএনপি ৩৭.৮২%, জাতীয় পার্টি ৯.২৩% জামায়াত ইসলামী ৩.৩১% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ২.০৪% ভোট পায়।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৫৯.৭২% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৩.৬৫%, ৪ দলীয় জোট ৫১.৭৩%, জাতীয় পার্টি ৩.৮৪%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৭৮% ভোট পায়।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৩.৫৬% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় মহাজোট ৫৬.৭৬%, ৪ দলীয় জোট ৩৫.৯৪%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৭.০৩% ভোট পায়।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পঞ্চম, অষ্টম সংসদে বিএনপি, সপ্তম ও নবম সংসদে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। অর্থাৎ জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমানে সমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। তার সঙ্গে লড়াই হবে জাময়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুল রহমান। গত ৮ মাস আগে তাকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। জামায়াত অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠিক অবস্থা জানান দিচ্ছেন। তবে বিএনপির প্রার্থী নতুন হলেও সাংগঠনিক ভিত্তি বেশ শক্ত। সেই সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা ১৫ আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা বেশ মজবুত। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহমেদ মজুমদার কারাগারে আটক রয়েছেন। বেশিরভাগ স্থানীয় নেতারা পলাতক। কর্মীরা নিরব। তাছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বলয়ের বাইরে থাকছে। এই অবস্থায় জামায়াত-বিএনপির মধ্যে নির্বাচনী লড়াই সীমাবদ্ধ থাকলেও আওয়ামীগের নিরব অংশটি জয়-পরাজয়ের বড় ফ্যাক্টর। তাদের ভোট কেন্দ্রে নিতে জামায়াত বিএনপি বেশ তৎপর রয়েছে। এছাড়া নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের বড় একটি অংশ বসবাস করে এই সংসদীয় আসনে। তারা যে দিকে যাবে সেইদিকে জয়ের পাল্লা ভারী হবে এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনএনিউজ/ সৈয়দ সাকিব/এইচ.এম।
![]()
