বিএনএ ডেস্ক: ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এক স্বৈরাচারের পতনের পর দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল এক শান্ত, সুন্দর ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের। কিন্তু সেই বিপ্লবের নাম ভাঙিয়ে একদল তরুণ কি দেশকে ঠেলে দিচ্ছে চরম সংস্কৃতির অবমাননা আর উগ্রতার দিকে? ময়মনসিংহের এক সাধারণ ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক থেকে হঠাৎ কীভাবে দেশজুড়ে উশৃঙ্খলতার সমার্থক হয়ে উঠলেন আ ন ম আয়াস? এবং সর্বশেষ, তার উগ্রতার বিরুদ্ধে কীভাবে গর্জে উঠলেন ঢাকার এক সাধারণ রিকশাচালক? আজ আমরা দেখবো ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে আ ন ম আয়াসের একের পর এক আইন অমান্য করার ধারাবাহিক চালচিত্র। দেখতে থাকুন শেষ পর্যন্ত।
আ ন ম আয়াস। বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফলে হলেও তার ছাত্রজীবন ও রাজনীতির মূল অংশ কেটেছে ময়মনসিংহে। আনন্দ মোহন কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করা এই তরুণ ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে ময়মনসিংহে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং মহানগর শাখার সদস্যসচিবের পদ পান। ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তিনি ঢাকায় এসে গঠন করেন ‘রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম’ বা এসডিএফ নামের একটি দল, যার সভাপতিও নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু এরপরই তার রাজনৈতিক মতাদর্শ রূপ নেয় চরম উগ্রতায়।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর রাজনৈতিক মাঠ যখন শান্ত হওয়ার কথা, ঠিক তখনই প্রকাশ্যে আসে আয়াসের মারমুখী রূপ। ২০২৬ সালের ৪ঠা আগস্ট, ঠিক দুই বছর পূর্তির আগের দিন। ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘নতুন ধারা বাংলাদেশ’ বা এনডিবি নামের একটি দলের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয় আয়াসের রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের কর্মীরা। মাঝ রাস্তায় লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা এবং মারধরের এই ঘটনায় আয়াস নিজেও আহত হন। এটিই ছিল ঢাকার বুকে তার প্রথম উশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক সূচনা।
এর ঠিক ১১ দিন পর, ১৫ই আগস্ট, ২০২৬। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে আসা সাধারণ মানুষদের ওপর নেমে আসে চরম নির্যাতন। আয়াস এবং তার অনুসারীরা সেখানে লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান নেয়। পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে কিংবা কৌতূহলবশত সেখানে আসা এক লুঙ্গি পরা অসহায় রিকশাচালককে তারা ঘেরাও করে। আয়াসের নেতৃত্বে ওই রিকশাচালকের ওপর চালানো হয় মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন। “কেন সে ওখানে এসেছে”, “সে আওয়ামী লীগের লোক কি না”—এমন সব উগ্র জেরার মুখে কাঁপতে থাকা রিকশাচালককে মারধর করে আরও তিনজনের সাথে আটকে রাখা হয় এবং বলপূর্বক পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ফ্যাসিবাদ দমনের নামে একজন নিরীহ শ্রমজীবী মানুষের ওপর এই ‘মব জাস্টিস’ এবং বলপ্রয়োগের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে।
কিন্তু আয়াসের উশৃঙ্খলতা এখানেই থেমে থাকেনি। রাজনৈতিক ইস্যু ছাড়িয়ে এবার তিনি হানা দেন ক্রীড়াঙ্গনের তারকার বাড়িতে। ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬। মাগুরা সফরে যান আয়াস। সেখানে গিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের মাগুরার বাসার মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগ করেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই চরম অশোভন দৃশ্যটি ভিডিও করে সাকিবের উদ্দেশ্যে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের রাজনৈতিক কর্মীর এমন নোংরা আচরণ দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো দেশ।
এবার আয়াসের টার্গেট দেশের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ১০ই অক্টোবর, ২০২৬, দুপুরবেলা। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি লেপে তা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেন আয়াস। তার দাবি—এটি ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতীক! শাহবাগ থানা পুলিশ তাকে হাতেনাতে ধরে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে এবং ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়।
কিন্তু গল্পের সবচেয়ে বড় টুইস্ট আসে ঠিক এর পরপরই। আয়াস গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেই চুনকালি মাখানো দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়ান আরেকজন সাধারণ রিকশাচালক। তার চোখে-মুখে ছিল সংস্কৃতির এই অবমাননার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ। সেই খেটে খাওয়া রিকশাচালক কোনো উগ্রতা দেখাননি, কোনো মারামারি করেননি। তিনি নিজের রিকশা থামিয়ে, জল এনে নিজ হাতে পরম মমতায় কবিগুরুর মুখের ওপর লেপ্টে দেওয়া সেই চুনকালি ধুয়ে পরিষ্কার করতে শুরু করেন! যে সমাজকে আয়াসের মতো তরুণরা উগ্রতা দিয়ে কলুষিত করতে চেয়েছিল, সেই সমাজকে এক বালতি জল আর এক টুকরো কাপড় দিয়ে সংস্কৃতির মর্যাদা ফিরিয়ে দিলেন এক সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। সামাজিক মাধ্যমে রিকশাওয়ালার এই প্রতিবাদের ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। উগ্রতার গালে এটি ছিল এক নীরব কিন্তু প্রচণ্ড চপেটাঘাত!
৫ই আগস্ট পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিবাদের অধিকার সবার আছে। কিন্তু প্রতিবাদের নামে সংস্কৃতির অবমাননা, মব জাস্টিস কিংবা উগ্র আচরণ করা কি কোনো সুস্থ ধারার রাজনীতি হতে পারে? একদিকে বিপ্লবের চেতনাকে পুঁজি করে আ ন ম আয়াসের মতো তরুণদের এই ধ্বংসাত্মক উগ্রতা, আর অন্যদিকে আমাদের সংস্কৃতির শেকড়কে আগলে রাখা সাধারণ এক রিকশাচালকের দেশপ্রেম। বাংলাদেশ আসলে কোন পথে যাবে? উগ্রতার পথে, নাকি সম্প্রীতির পথে? আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টে জানান। ভিডিওটি ভালো লাগলে লাইক ও শেয়ার করুন।
বিএনএ / শাম্মী
![]()

