23 C
আবহাওয়া
৪:৩৭ পূর্বাহ্ণ - এপ্রিল ২৭, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নয়- আলাদ হলো এনসিপির ‘সেভেন সিস্টার্স’!

ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নয়- আলাদ হলো এনসিপির ‘সেভেন সিস্টার্স’!


বিএনএ, ঢাকা : জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)র হাসনাত আবদুল্লাহর এই মন্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ভূ-রাজনীতিতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে কেন্দ্র করে দেওয়া এই হুমকি যতটা না দিল্লিকে কাঁপিয়েছে, তার চেয়ে বেশি বেকায়দায় ফেলেছে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারকে।

হাসনাতের এই বক্তব্যের পর ভারত-বাংলাদেশের কুটনৈতিক সর্ম্পকে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়। সরকারকে বিবৃতি দিয়ে বলতে হয়, হাসনাত আব্দুল্লাহ সরকারের অংশ নয়।
প্রসঙ্গত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য—অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরাকে একত্রে ‘সেভেন সিস্টার্স’ বলা হয়। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’-এর মাধ্যমে মূল ভারতের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এই অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। হাসনাত আবদুল্লাহ এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা ভারতের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার শামিল ছিল।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মাত্র ১৩ দিন আগে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য বা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে তার মন্তব্য নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মতো তার নিজের দলে ফিরে এসেছে। হাসনাত যখন বিদেশের ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করার স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন ভাগাভাগির জোট গঠন ইস্যুতে এনসিপির ‘প্রাণশক্তি’ হিসেবে পরিচিত সাত নারী নেত্রী আলাদা অবস্থান বিপ্লব পরবর্তীতে গঠিত দলটিকে চরম অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে।
এনসিপির অভ্যন্তরে ঘটে গেছে রীতিমতো এক নীরব বিপ্লব। দলের অন্যতম দুই শীর্ষ নারী মুখ ডা. তাসনিম জারা এবং তাজনুভা জাবিন পদত্যাগ করেছেন।

নির্বাচন থেকে সরে দাড়িয়েছেন নওগাঁ–৫ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী, দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের আরেক নেত্রী এবং এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুমও নির্বাচনকালীন সময়ে দলটির সব কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যরাও দুই একদিনের মধ্যে ঘোষণা দিবেন। নীলা ইসরাফিল তো- আগেই দল ত্যাগ করেছেন।

নীলা এবার ৬ নারী সঙ্গে যুক্ত হয়ে জামায়াত ইসলামী সঙ্গে জোট গঠন করার ইস্যুতে এনসিপির মুখোশ খুলে দিচ্ছেন। তার দাবি এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনেকে এক সময় ইসলামী ছাত্র শিবিরের গুপ্ত রাজনীতি সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এনসিপির সাবেক নেত্রী নীলা ইস্রাফিল এক ভিডিও বার্তায় জানান, এনসিপি জামায়াত ইসলামীর কাছে দেড় কোটি টাকায় বিক্রি হয়ে গেছে।

একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সামান্তা শারমিন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যে সংস্কারের স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছে, সেই আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে জোট গঠন এনসিপির মূল চেতনার পরিপন্থী। সামান্তার মতে, এই জোট এনসিপিকে ‘সংস্কারবিরোধী ঐক্যজোটে’ রূপান্তর করছে।

গত ২৫ শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় হুট করেই এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পর্যায়ের ছয় নেত্রীকে ফেসবুকে একটি ছবি আপলোড করতে দেখা যায়। ছবিতে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসুম, যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনুভা জাবিন, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা ও সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নাহিদা সারোয়ার নিভাকে দেখা যায়।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনার মধ্যে যে ছবি জন্ম দেয় আগ্রহের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় এক বৈঠকে অংশ নেন এই ছয় নেত্রী। বৈঠকে তারা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া জামায়াত-এনসিপির আসন সমঝোতা নিয়ে ভেটো দেন। তুলে ধরেন নিজেদের মতামত।

বৈঠকে অংশ নেওয়া এই ৬ নারী নেত্রী এবং বেশ কিছুদিন আগে দল ছেড়ে দেওয়া নীলা ইস্রাফিলসহ—আলোচিত এই সাতজনকে কেন্দ্র করেই এখন রাজনৈতিক মহলে ‘এনসিপির সেভেন সিস্টার্স’ পরিভাষাটি উচ্চারিত হচ্ছে। ভারতের সাতটি রাজ্যের মতো এই সাত নারী নেত্রীও যেন এনসিপির এক একটি শক্তিশালী স্তম্ভ ছিলেন।
প্রসঙ্গত, সরোয়ার তুষারের ‘লাগালাগি’ ইস্যুতে মডেল নীলা ইস্রাফিলের প্রস্থান দিয়ে শুরু হয় জাতীয় সার্কাস পার্টি খ্যাত এনসিপিতে অস্থিরতা। যা জারা-তাজনুভাদের পদত্যাগের মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছে।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেপথ্য কারিগর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ম্যাটিকুলাস ডিজাইন আন্দোলনের মাস্টার মাইন্ড জাতীয় সার্কাসের অংশ হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জোটের ঘোষণার পর পরই নিজ অবস্থান পরিষ্কার করলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তিনি এই এনসিপির অংশ হচ্ছেন না বলে ঘোষণা করেছেন। একইসঙ্গে নিশ্চিত করেছেন, জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে তাকে ঢাকার একটি আসনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন । রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
ফেসবুক পোস্টে মাহফুজ আলম লিখেন, ঢাকার কোনো একটা আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হওয়ার চাইতে আমার ‘লং স্টান্ডিং পজিশন’ ধরে রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।’

জুলাই অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নাগরিক কমিটি ও এনসিপি জুলাইয়ের সম্মুখসারির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল। গত দেড় বছর আমি চাহিবামাত্র তাদেরকে পরামর্শ, নির্দেশনা এবং পলিসিগত জায়গায় সহযোগিতা করেছি। এনসিপিকে একটা ‘বিগ জুলাই আম্ব্রেলা’ আকারে স্বতন্ত্র উপায়ে দাঁড় করানোর জন্য আমি সকল চেষ্টাই করেছি। কিন্তু, অনেক কারণেই সেটা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপি নতুন বন্দোবস্ত ও সংস্কারের কথা গল্প শুনালেও শীর্ষ নেতারা ক্ষমতার জামায়াত ইসলামীর মতো কট্টর দক্ষিণপন্থী দলের আপস করায় দলটির নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে গেছে। এনসিপির বড় একটি অংশ ছিল শিক্ষিত ও সচেতন নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সাত নারী নেত্রী বা ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর এই বিচ্ছেদ দলটিকে একপেশে এবং পুরুষতান্ত্রিক দল হিসেবে পরিচিত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের ভোট ব্যাংক পেলেও এনসিপি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ভারতের সেভেন সিস্টার্সকে আলাদা করার স্বপ্ন দেখতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর দল এখন নিজেই তার আপন ‘সিস্টার্স’দের হারিয়ে এক গভীর রাজনৈতিক চোরাবালিতে নিমজ্জিত।

বিএনএনিউজ/সৈয়দ সাকিব/ এইচ.এম।

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ