বিএনএ, ঢাকা: বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি মো. নুরুল হক প্রকাশ ভিপি নুর বিএনপিতে যোগ দেয়া অনেকটা নিশ্চিত। তবে দলবল নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিবেন নাকি নির্বাচন ভিত্তিক জোট সঙ্গী হবেন তা এখনও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। তাঁর সংসদীয় এলাকা পটুয়াখালী- ৩ গলাচিপা-দশমিনা সংসদীয় আসনে সাংগঠনিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে দলীয় নেতা–কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। গত ২২ অক্টোবর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পটুয়াখালী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘গত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর সংসদীয় এলাকা পটুয়াখালী-৩, গলাচিপা-দশমিনায় জনসংযোগ ও তাঁর দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য আপনাদের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় এলাকার থানা, উপজেলা বা পৌরসভায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীদের বিষয়টি অবহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করতে আপনাদের অনুরোধ করা হচ্ছে। এই আদেশ অতীব জরুরি বলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এই নির্দেশনা নিয়ে বিএনপিসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
বিএনপির নেতা–কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নুরুল হকের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চর বিশ্বাস ইউনিয়নে। ফলে পটুয়াখালী-৩ গলাচিপা-দশমিনা আসন থেকে তাঁর নির্বাচন করার গুঞ্জন চলছে দীর্ঘদিন ধরে। অপর দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. হাসান মামুনের বাড়ি দশমিনা উপজেলা সদরে। তিনি পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
চিঠি প্রসঙ্গে হাসান মামুন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই চিঠির সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে গেলে কিছু উচ্ছৃঙ্খল লোক তাঁকে বাধাগ্রস্ত করে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে উলানিয়ায় নুরুল হকের ওপর হামলা হয়েছিল। পুনরায় যাতে কেউ এ রকম ঘটনা না ঘটাতে পারে, সেই লক্ষ্যেই মূলত বিএনপির সহযোগিতা করার নির্দেশ। এটা ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে গঠিত হয় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ছাত্র অধিকার পরিষদ। ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা তাদের অবস্থান এবং গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করে প্যানেল করে নির্বাচনে অংশ নেয়। এ নির্বাচন নিয়ে নানান মতবাদ ও কারচুপির অভিযোগ থাকলেও ভিপি এবং সমাজসেবা পদে জয়লাভ করেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের দুই নেতা। ধীরে ধীরে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সারাদেশে সু-সংগঠিত হতে থাকে সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ। যার ফলশ্রুতিতে অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর গণঅধিকার পরিষদ নামে রাজনৈতিক দলটির আত্মপ্রকাশ হয়।
কিন্তু ২০২৩ সালের জুনে দলটির আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া ও সদস্যসচিব নুরুল হক একে অপরকে পাল্টাপাল্টি অব্যাহতি দেন। পরে নুরুল হকের সমর্থকেরা ১০ জুলাই দলের জাতীয় কাউন্সিল করেন। তাতে নুরুল হক সভাপতি ও মুহাম্মদ রাশেদ খান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তবে আরেক পক্ষ রেজা কিবরিয়াকে আহ্বায়ক ও ফারুক হাসানকে ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব করে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে কার্যক্রম চালায়। ২৬ সেপ্টেম্বর রেজা কিবরিয়া তার নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দিতে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন। তবে নির্বাচন কমিশন তা নামঞ্জুর করে। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর রেজা কিবরিয়া গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে যান।
একইভাবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ভিপি নুরের দল গণঅধিকার পরিষদ নিবন্ধনের আবেদন করলেও তা নাকচ হয়। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে প্রথমে কোটা বিরোধী আন্দোলন ও এক দফার আন্দোলনে আড়ালের বড় শক্তি ছিল ভিপি নুর ও তার দল গণ অধিকার পরিষদ। ৫ই আগষ্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ২রা সেপ্টেম্বর গণ অধিকার পরিষদ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায়। দলটির নির্বাচনী প্রতীক হলো ট্রাক।
উল্লেখ্য, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও তাদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক কমিটি রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ ইস্যুতে বঙ্গভবন ঘেরাও করে ৪৮ ঘন্টার যে আল্টিমেটাম দিয়েছিল তার বিরোধীতা করে নুরুল হক নুর ও তার দল গণঅধিকার পরিষদ। সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি না করার জন্য বিএনপি’র পক্ষ থেকে কড়া হুশিয়ারি দেয়া হয়। এই অবস্থায় ভিপি নুরকে পটুয়াখালী-৩ সংসদীয় আসনে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করার কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্দেশনা রাজনীতি নতুন মেরুকরণের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোনের ফসল খ্যাত অন্তর্বতীকালীন সরকারের সঙ্গে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সমর্থন হারাচ্ছে, বাড়ছে রাজনৈতিক মতবিরোধ ও দূরত্ব, এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনএ/ সৈয়দ সাকিব,ওজি
![]()

