31 C
আবহাওয়া
৮:৫৪ অপরাহ্ণ - অক্টোবর ১৪, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » পদ্মার ইলিশের নামে এ কী গিলছে দেশের মানুষ!

পদ্মার ইলিশের নামে এ কী গিলছে দেশের মানুষ!


বিএনএ, ঢাকা: ভারতীয়  ইলিশে  এখন বাজার সয়লাব! “ভুল শুনছেন  কি?  না!  বেশ কিছদিন ধরে বাজারে  ভারতীয় ইলিশের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আর এই সুযোগে অসাধু বিক্রেতারা সাধারণ ক্রেতাদের দেদারসে ঠকাচ্ছে।  বাজার থেকে যে মাছটিকে আপনি চড়া দামে ‘পদ্মার খাঁটি ইলিশ’ ভেবে কিনছেন, সেটি আসলে আসল ইলিশ তো?  নাকি হাজার মাইল দূরের লোনা পানির কোনো স্বাদহীন মাছ?

YouTube player

যে দেশ পৃথিবীর মোট ইলিশের সিংহভাগ উৎপাদন করে, সেই দেশের মানুষ এখন চড়া দামে ভারতের লোনা মাছ গিলছে! কিন্তু কীভাবে ঘটলো এই ঐতিহাসিক লজ্জা? কারা এই কারসাজির পেছনে? জানতে হলে দেখতে হবে আজকের এই রোমহর্ষক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

“একসময় ইতিহাস ছিল অন্যরকম। দুর্গাপূজা এলেই ওপার বাংলার মানুষ চাতক পাখির মতো মুখিয়ে থাকতো বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের জন্য। অথচ ২০২৬ সালের চিত্র, ওপাড়ে এক ছটাক মাছও যায়নি, কিন্তু ওপার থেকে ট্রাকে ট্রাকে মাছ আসছে এপারে।

বেনাপোল কাস্টমসের অফিশিয়াল ডাটা বলছে—চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই আর আগস্ট, মাত্র এই দুই মাসেই ভারত থেকে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে ঢুকেছে! যার মধ্যে শুধু বেনাপোল সীমান্ত দিয়েই এসেছে ৩ লাখ ৫২ হাজার কেজিরও বেশি মাছ। কিন্তু কেন এই আত্মসমর্পণ? আমাদের নদীগুলোর বুক আজ খালি কেন?

দেশের এই নজিরবিহীন সংকটের পেছনের কারণ কী? দেশের অন্যতম শীর্ষ ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান মনে করেন, ইলিশের প্রাকৃতিক চলাচল বা অভিবাসনপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, অতিরিক্ত নদীদূষণ, কারেন্ট জাল দিয়ে জাটকা নিধন এবং নদীর মোহনায় অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন—সব মিলিয়ে ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।  যার ফলে বাংলাদেশের জলসীমার ভেতরে নদীর অংশে ইলিশের সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

সরকারি তথ্যও গবেষকদের এই উদ্বেগকে সত্যি প্রমাণ করছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে যেখানে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন, তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টনে নেমে আসে। আর এই ভরা মৌসুমেও দেশি ইলিশের তীব্র সংকটের সুযোগ নিয়েছে একদল রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী।

ভারত থেকে আসা এই মাছগুলো কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মিঠা পানির মাছ নয়। ব্যবসায়ীরা আরব সাগর ও নর্মদা নদীর মোহনা সংলগ্ন গুজরাটের ভারুচ অঞ্চল থেকে এগুলো সংগ্রহ করছে。সেখানে ডিমভর্তি এই লোনা মাছের কদর কম থাকায়, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে তা এদেশের বাজারে চালান করে দিচ্ছে। কিন্তু এর পেছনের আসল কারসাজিটা লুকিয়ে আছে দামের হিসাবে।

কাস্টমসের গোপন নথি ফাঁস করে দিচ্ছে আমদানির আসল হিসাব। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আমদানিকারকরা ভারত থেকে প্রতি কেজি ইলিশের ক্রয়মূল্য (ঘোষিত মূল্য) দেখাচ্ছেন মাত্র ৫৭ টাকা থেকে ২৫২ টাকা! হ্যাঁ, আপনি ভুল শুনছেন না! এর সাথে সরকারের প্রায় ২০০ টাকার শুল্ক-কর এবং এলসি খরচ মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের কেজি প্রতি সর্বোচ্চ খরচ পড়ছে ৫०० থেকে ৫১৫ টাকা।

অথচ, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আমদানিকৃত এই মাছ খালাস করতে ব্যবসায়ীদের ৫০০ টাকা খরচ হলেও, দেশের খুচরা বাজারে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র এগুলোকে ‘বরিশাল ও চাঁদপুরের তাজা ইলিশ’ বলে চালিয়ে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে! প্রতি কেজিতে ১০০০ টাকারও বেশি নিট মুনাফা লুটছে তারা, আর পকেট কাটা যাচ্ছে সাধারণ মধ্যবিত্ত ভোক্তার।”

এই জালিয়াত চক্রের হাত থেকে নিজের পকেট এবং পেট বাঁচাবেন কীভাবে? ইলিশ ব্যবসায়ী ও গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী গুজরাটের এই মাছ চেনার ৫টি মোক্ষম উপায় সবসময় মাথায় রাখুন—”

১. শরীরের গড়ন: “দেশি পদ্মা বা চাঁদপুরের ইলিশ হবে পটলের মতো গোলগাল আর পেটের দিকটা ভরাট। আর গুজরাটের মাছ হবে লম্বাটে, চ্যাপ্টা ও সরু।”

২. খুনে লাল চোখ: “নদীর তাজা মাছের চোখ হবে পানির মতো পরিষ্কার। আর ভারত থেকে মাসের পর মাস বরফে আসা মাছের চোখ হবে কালচে লাল বা ঘোলাটে।”

৩. গায়ের রঙ: “দেশি মাছের শরীর থেকে রুপালি-সোনালি আলোর ঝিলিক বের হবে। কিন্তু গুজরাটের মাছের পিঠ হবে কালচে বা ধূসর।”

৪. ইলাস্টিসিটি: “দেশি ইলিশ হাতে তুললে কাঠের মতো সোজা ও শক্ত থাকবে। আর আমদানিকৃত মাছ নরম হয়ে ধনুকের মতো ঝুলে পড়বে।”

৫. রান্নার ঘ্রাণ: “দেশি ইলিশের প্রধান হাতিয়ার তার সুঘ্রাণ। রান্নার সময় পুরো পাড়া মৌ মৌ করবে। অথচ গুজরাটের মাছ চিবোলে মাংস শক্ত লাগবে, স্বাদ হবে একদম পানসে ও অতিরিক্ত নোনতা।”

 

ইলিশ আমাদের আবেগ, আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। কিন্তু এই আবেগকে পুঁজি করে যারা হাজার কোটি টাকার প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে, তাদের রুখে দেওয়ার সময় এসেছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কড়া নজরদারি যেমন প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন আপনার সচেতনতা। বাজারে গিয়ে সস্তা দেখলেই কিংবা বিক্রেতার ফাঁকা বুলি শুনে অন্ধের মতো মাছ কিনবেন না।”

 

শামীমা চৌধুরী শাম্মী

 

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ